যোগ দর্শন অনুযায়ী ঈশ্বর তত্ত্বের বর্ণনা দাও

আজকের আলচনা পর্বে আলচ্য বিষয় হল-মহর্ষি পতঞ্জলির মনন ও আধ্যাত্মিক আনুভূতির ফসল যোগদর্শন। এই দর্শনশাস্ত্রের একটি অতি প্রাচীন প্রশ্ন হল-   যোগ দর্শনে ঈশ্বরের স্বরূপ কী? ঈশ্বরের অস্তিত্বসাধক প্রমাণগুলি লেখো। 

যোগ দর্শনে ঈশ্বরের স্বরূপ কী ঈশ্বরের অস্তিত্বসাধক প্রমাণগুলি লেখো।
যোগ দর্শনে ঈশ্বরের স্বরূপ কী ঈশ্বরের অস্তিত্বসাধক প্রমাণগুলি লেখো।

 

Contents hide
1 যোগ দর্শনে ঈশ্বরের স্বরূপ কী? ঈশ্বরের অস্তিত্বসাধক প্রমাণগুলি লেখো।

যোগ দর্শনে ঈশ্বরের স্বরূপ কী? ঈশ্বরের অস্তিত্বসাধক প্রমাণগুলি লেখো। 

 

যোগদর্শনে ঈশ্বরের স্বরূপ

ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রে ষড়দর্শনের অন্যতম হলো যোগদর্শন। মহর্ষি পতঞ্জলি এই দর্শনের প্রবর্তক। সাধারণত যোগদর্শনকে ‘নিরীশ্বর সাংখ্য’ দর্শনের বিপরীত ‘সেশ্বর সাংখ্য’ বলা হয়, কারণ সাংখ্য দর্শন ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার না করলেও যোগদর্শন মোক্ষ বা সমাধি লাভের অন্যতম পথ হিসেবে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে পরম গুরুত্বের সাথে স্বীকার করেছে।

মহর্ষি পতঞ্জলি যোগসূত্রের সমাধিপাদে ঈশ্বরের উল্লেখ ও স্বরূপ নিরূপণ করেছেন। সমাধিলাভের বিকল্প উপায় বলতে মহর্ষি ‘ঈশ্বর প্রণিধানের’ উল্লেখ করেছেন। ঈশ্বর প্রণিধান হলো একপ্রকার ভক্তি, অর্থাৎ ঈশ্বরের চিত্তে, ঈশ্বরে সমস্ত কর্ম ও কর্মফল অর্পণ ও শ্রদ্ধার দ্বারা সমাধি লাভ হয়। সুতরাং যোগ দর্শনে সমাধিলাভের ব্যবহারিক প্রয়োজনে ঈশ্বর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে।

ঈশ্বরের স্বরূপ:

যোগদর্শনে ঈশ্বরের স্বরূপ আলোচনা করতে গেলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উঠে আসে:

 ১. ক্লেশ ও কর্মমুক্ত পুরুষ বিশেষ

মহর্ষি পতঞ্জলি যোগসূত্রে ঈশ্বরের লক্ষণ দিতে গিয়ে বলেছেন— “ক্লেশকর্মবিপাকাশয়ৈরপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষঃ ঈশ্বরঃ।” (সমাধিপাদ ২৪)।  পতঞ্জলি বর্ণিত ‘ক্লেশ’ হলো— অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও মৃত্যু ভয়। ‘কর্ম’ হলো পাপ ও পুণ্য। ‘বিপাক’ হলো কর্মের ফল এবং ‘আশয়’ হলো কর্মফল ভোগের বাসনা। ঈশ্বর এইসকল ক্লেশ, কর্ম, বিপাক ও আশয় থেকে সদা মুক্ত। ঈশ্বর এক বিশেষ পুরুষ। সাধারণ পুরুষ প্রকৃতির সন্নিধানে এসে ক্লেশাদি ভোগ করে। ঈশ্বর কিন্তু সাধারণ পুরুষ যখন কৈবল্য প্রাপ্ত হন তখন ক্লেশাদি থেকে মুক্ত থাকেন কিন্তু ঈশ্বর কৈবল্য প্রাপ্ত হন না, কারণ তিনি সদা মুক্ত।

২. জগৎ সৃষ্টির কর্তাদেরও উপদেষ্টা

যোগ মতে, ঈশ্বর জগতের স্রষ্টা নন, অর্থাৎ তিনি স্বয়ং জগৎ সৃষ্টি করেন না। শ্রুতিতে বলা হয়েছে ব্রহ্মা হলেন জগতের সৃষ্টিকর্তা। ঈশ্বরের ইচ্ছামাত্রে ব্রহ্মা জগৎ সৃষ্টি করেন। যোগ মতে, সৃষ্টি কালে ও প্রলয়কালে ব্রহ্মার সৃষ্ট জগৎ-এর বিনাশ প্রাপ্ত হয়, এমনকি ব্রহ্মারও বিনাশ হয়। কিন্তু ঈশ্বর সৃষ্টি বিনাশ রহিত। তিনি শুধুই সাধারণ জীবেরই উপদেষ্টা নন, জগৎ সৃষ্টির কর্তাদেরও উপদেষ্টা।

৩. প্রণব বা ওঙ্কার :

যোগদর্শনে শব্দব্রহ্ম বা ‘ওঙ্কার’-কে ঈশ্বরের বাচক বা প্রতীক বলা হয়েছে। ‘তস্য বাচকঃ প্রণবঃ’— অর্থাৎ সেই ঈশ্বরের নাম হলো ‘ওঁ’। এই পবিত্র শব্দের জপ এবং এর অর্থ অনুধাবন যোগীগণের চিত্ত স্থির করতে সাহায্য করে।

৪. সর্বজ্ঞতা ও জ্ঞানের উৎস:

ঈশ্বর হলেন সকল জ্ঞানের আকর। পতঞ্জলি বলেছেন— “তত্রাতিশায়ং সর্বজ্ঞত্ববীজম্। অর্থাৎ, আমাদের জ্ঞান সসীম, কিন্তু যার মধ্যে জ্ঞান চরম সীমায় পৌঁছায় এবং অসীম হয়, তিনিই ঈশ্বর। তিনি সকল গুরুদেরও আদি গুরু এবং কাল দ্বারা অপরাজিত।

ঈশ্বরের অস্তিত্বসাধক প্রমাণ:

মহর্ষি পতঞ্জলি পৃথকভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে কোনো প্রমাণ দেননি। ঈশ্বর প্রণিধান প্রসঙ্গে মহর্ষি ঈশ্বরের যে লক্ষণ দিয়েছেন তা ৫টি সূত্রে আছে, তা থেকেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়।

প্রথমত, “তত্রাতিশায়ং সর্বজ্ঞত্ববীজম্” (Argument from the Seed of Omniscience):

যুক্তিঃ- জগতে আমরা জ্ঞানের তারতম্য দেখতে পাই। কারো জ্ঞান কম, কারো বেশি। যেখানেই কোনো গুণের কম-বেশি (তারতম্য) থাকে, সেখানে সেই গুণের একটি সর্বোচ্চ সীমা বা পরাকাষ্ঠা থাকা প্রয়োজন। ঈশ্বর সর্বজ্ঞ পুরুষ। জীবের মধ্যে যে জ্ঞান আছে তা অসীম নয়। ক্ষুদ্র জ্ঞানের কথা চিন্তা করতে গেলেই অনন্ত জ্ঞানের কথা চিন্তা করতে হবে। জীবের জ্ঞান যেহেতু অসীম হতে পারে না, তাই পূর্ণ প্রজ্ঞালব্ধ জ্ঞানকেই এক সর্বজ্ঞ বীজ স্বরূপ ঈশ্বরের অস্তিত্বের অঙ্গীভূত স্বীকার করা হয়।

দ্বিতীয়ত, “স এষ পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেনানবচ্ছেদাৎ”।( Argument from Tradition/Guruship):

যুক্তিঃ- ঈশ্বর পূর্ব-পূর্ব গুরুদেরও গুরু, কারণ তিনি কোনো কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। আমাদের ভিতরে যে জ্ঞান আছে তার উন্মেষের জন্য কোনো গুরুর প্রয়োজন, কোনো মানুষ সসীম হওয়ায় তাদের পূর্বে গুরু ছিলেন একথা স্বীকার্য। সুতরাং স্বীকার করতে হয় এমন একজন গুরু আছেন যিনি কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন, সেই অনাদি অনন্ত জ্ঞানসম্পন্ন গুরুই ঈশ্বর।

তৃতীয়ত, শ্রুতি বা শাস্ত্রের প্রমাণ (Argument from Scripture):

যোগমতে, বেদ বা শ্রুতি হলো অভ্রান্ত সত্যের আকর।

যুক্তি: শাস্ত্র বা বেদে ঈশ্বরের অস্তিত্ব ঘোষণা করা হয়েছে। ঈশ্বর যেমন অভ্রান্ত, তাঁর বাক্য অর্থাৎ বেদও তেমনই অভ্রান্ত। এই শাস্ত্রীয় সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয়। আবার যোগীদের অতীন্দ্রিয় প্রত্যক্ষলব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমেও শাস্ত্রীয় সত্যের সমর্থন পাওয়া যায়।

চতুর্থত, শ্রুতি বা শাস্ত্রের প্রমাণ (Argument from Scripture):

যুক্তিঃ কোনো বস্তু ভাবা মাত্রই একটি বাচক শব্দ পাওয়া যায়। বাচক ও বাচ্যের সম্পর্ক, যেমন ‘গো’ শব্দ হলো বাচক এবং পশু বিশেষ হলো বাচ্য। একইভাবে ঈশ্বরের বাচক শব্দই ‘ওঁ’। শব্দ উচ্চারণ মাত্রই সাধকের মনে বাচ্য বা পরমেশ্বরের ভাব উদিত হয়। সুতরাং বাচ্য ও বাচকের নিত্য ও অনাদি সম্বন্ধরূপে ঈশ্বরের অস্তিত্ব রয়েছে।

পঞ্চমত, জগতের উপাদান ও চেতন্যের সংযোগ (Cosmological Argument):

যদিও যোগদর্শনে ঈশ্বর জগতের সরাসরি স্রষ্টা নন, তবুও জড় প্রকৃতি ও চেতন পুরুষের সংযোগ ঘটাতে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

যুক্তি: প্রকৃতি জড় এবং পুরুষ (জীবাত্মা) নিস্ক্রিয়। এই জড় প্রকৃতির মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা এবং পুরুষের ভোগের জন্য জগতের বিবর্তন শুরু করার জন্য একজন পরম চেতন সত্তার সান্নিধ্য প্রয়োজন। চুম্বক যেমন লোহাকে আকর্ষণ করে তার উপস্থিতি দিয়ে, ঈশ্বরও তাঁর সান্নিধ্যের মাধ্যমে প্রকৃতির বিবর্তন প্রক্রিয়া শুরু করেন। এই ব্যবস্থার পরিচালক হিসেবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, সমাধি লাভের উপায় হিসেবে প্রত্যক্ষ ফল (Practical Argument):

পতঞ্জলি বলেছেন— “ঈশ্বরপ্রণিধানাদ্বা”

যুক্তিঃ যোগীগণ যখন ঈশ্বরে ভক্তি ও একাগ্রতার সাথে আত্মসমর্পণ করেন, তখন তাঁরা অতি দ্রুত সমাধি লাভে সমর্থ হন। যোগ মতে, ঈশ্বরের সমস্ত কর্ম অপরের দ্বারা বা ঈশ্বরের ভক্তির দ্বারা যোগী পরম সমাধি ও কৈবল্য লাভে সমর্থ হন। সুতরাং সমাধি লাভের উপায় হিসেবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার্য।

উপসংহার:

উপরোক্ত প্রমাণগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, যোগদর্শনে ঈশ্বরকে মূলত জ্ঞানের পূর্ণতা (সর্বজ্ঞতা), পরম আদর্শ এবং সাধনার সহায়করূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। মূলত ‘সর্বজ্ঞত্ব’ এবং ‘আদিগুরুত্ব’—এই দুটি যুক্তিই যোগদর্শনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের প্রধান ভিত্তি।


Thanks For Reading: যোগ দর্শন অনুযায়ী ঈশ্বর তত্ত্বের বর্ণনা দাও। 

Read More:


SAQ:

১.যোগ দর্শন কী?

উত্তর– ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রে ষড়দর্শনের অন্যতম হলো যোগদর্শন। মহর্ষি পতঞ্জলি এই দর্শনের প্রবর্তক। সাধারণত যোগদর্শনকে ‘নিরীশ্বর সাংখ্য’ দর্শনের বিপরীত ‘সেশ্বর সাংখ্য’ বলা হয়।