
ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে ডেকার্তের যুক্তিগুলি আলোচনা কর।
বুদ্ধিবাদী ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত মনে করেন ঈশ্বর হলেন পূর্ন সত্তা, অনন্ত ইচ্ছা শক্তির আধার। তিনি আমাদের জ্ঞান বুদ্ধির উৎস। আমরা বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে এই সর্বশক্তিমান পরমাত্মার অস্তিত্ব জানতে পারি।
দেকার্ত তিনটি যুক্তির সাহায্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। প্রথম দুটি কারণ বিষয়ক যুক্তি, তৃতীয়টি তত্ত্ব বিষয়ক যুক্তি নামে অভিহিত।
প্রথমযুক্তি –
ঈশ্বর অনন্ত, সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। এই ধারণা আমাদের মনে আছে। ধারণাগুলির অবশ্যই কোন উৎস বা কারণ আছে। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা এই ধারণা পাইনা। আবার আমি সসীম জীব, অপূর্ন সত্ত্বা। আমার পক্ষে এই ধারণা গঠন করা সম্ভব নয়। কারণ যা অসীম তা কখনও সসীমের কার্য হতে পারে না। কাজেই বলতে হয়, আমার চেয়ে অধিক সত্ত্বাবান ব্যক্তি এইরূপ ধারণার কারণ বা উৎস। ওই পূর্ন সত্ত্বা হলেন ঈশ্বর যিনি আমাদের মনে ওইরূপ ধারণা সংস্থাপিত করেছেন। অতএব ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে।
দ্বিতীয়যুক্তি –
দ্বিতীয় যুক্তিটি প্রথমটির অনুরূপ। দেকার্ত নিজের অপূর্নতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। এই অপূর্নতার জ্ঞান থেকে অনন্তের অনুমান করেছেন। অনন্তের ধারণা সান্তের পূর্ববর্তী। আমাদের মনে অনন্তের ধারণা না থাকলে নিজের অপূর্নতা অনুভব করতে পারতাম না।
তৃতীয়যুক্তি –
দেকার্তের তৃতীয় যুক্তিটি তত্ত্ব বিষয়ক যুক্তি নামে খ্যাত। ঈশ্বরের ধারণা থেকে ঈশ্বরের বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণ করা এই যুক্তির উদ্দেশ্য। যুক্তিটি আমাদের মনে অবস্থিত ঈশ্বরের ধারণা থেকে ঈশ্বরের বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চায়। ঈশ্বরের ধারণা মানে পূর্ন সত্ত্বার ধারণা। কিন্তু যার অস্তিত্ব নেই তাকে পূর্ন বলা যায় না। যেহেতু ঈশ্বর পূর্নতম সত্ত্বা, সেই হেতু তার অস্তিত্ব শুধু চিন্তায় নেই, বাস্তবেও আছে।
দেকার্তের এই তত্ত্ববিষয়ক যুক্তিটি স্কোলাস্টিক দার্শনিক St . Anselem -এর অনুরূপ। অ্যানসেলেম বলেছেন – ‘The very conception of an infinite and absolutely perfect being logically implies the existence of such a being.’ – Wright . পূর্নতম সত্ত্বা, পূর্ন ও অসীম -অথচ তার অস্তিত্ব নেই, এরকম ভাবা যায়না। যদি ভাবা হয় তবে সেই চিন্তা আত্মবিরোধিতা দোষ দুষ্ট হবে। অর্থাৎ ঈশ্বরের ধারণার (idea of God) মধ্যে ঈশ্বরের বাস্তবতা (reality of God) নিহিত একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। অবশ্য দেকার্ত মনে করেন তাঁর প্রদত্ত যুক্তি অ্যানসেলেম প্রদত্ত যুক্তি থেকে ভিন্ন।
তিনি বলেন যে, পূর্নতম সত্ত্বা ঈশ্বরের ধারণার মধ্যে যে সব সংজ্ঞামূলক বিধেয় নিহিত আছে তাদের অন্যতম হল ‘অস্তিত্ব’ এই ধারণাটি। কারণ পূর্নতম সত্ত্বার প্রকৃতি হল অস্তিত্বশীল হওয়া। ঈশ্বরের ধারণার মধ্যে কেবল যে অস্তিত্বের ধারণা নিহিত আছে তা নয়, অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্ব পূর্নতম সত্ত্বার ধারণার অন্তর্ভুক্ত। পূর্নতম সত্ত্বার ধারণা আমাদের মনে আছে। পূর্নতম সত্ত্বার প্রকৃতি হল অস্তিত্বশীল হওয়া। অতএব, ঈশ্বর অস্তিত্বশীল, যথার্থই তাঁর অস্তিত্ব আছে।
সমালোচনা –
দেকার্তের যুক্তি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। দেকার্ত ধরে নিয়েছেন আমাদের মনে ঈশ্বরের ধারণা আছে। এই ধারণা সহজাত। লক প্রমাণ করেন যে ঈশ্বরের ধারণা অন্তর ধারণা নয়। সব মানুষের মনে ঈশ্বরের ধারণা স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল নয়। আবার ঈশ্বরে অবিশ্বাসী মানুষও আছে।
প্রথমত,
অ্যানসেলেমের পরে দেকার্তের যুক্তি আবার একটি বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এই বিতর্কিত বিষয়টি হল – ‘existence’ কি কোনো কিছুর Property বা Predicate হতে পারে? দেকার্ত ধরে নিয়েছেন যে, ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারণা ইশ্বরের ধারণার মধ্যে analytically belong করে; অর্থাৎ ‘existence’ কোনো কিছুর ‘Predicate’ বা বিধেয় হতে পারে। Russel বলেন – ব্যাকরণের দিক থেকে ‘অস্তিত্ব’ এই ধারণাটি বিধেয়রূপে গণ্য হলেও যৌক্তিক দিক থেকে এর কাজ ভিন্ন।
দ্বিতীয়ত,
অ্যাকুইনাস বলেছেন যে, দেকার্তের যুক্তি খুবই দুর্বল। দেকার্ত অস্তিত্বকে গুণ হিসাবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু কোনো টেবিলের লাল বর্ন যে অর্থে গুণ, অস্তিত্ব সেই অর্থে টেবিলের গুণ হতে পারেনা। তাছাড়া অস্তিত্বশীল হওয়া যদি টেবিলের গুণ হয়, তবে ঈশ্বর অস্তিত্বশীল কিনা, এই প্রশ্ন অবান্তর হয়ে পড়ে।
Thanks For Reading: ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে ডেকার্তের যুক্তি।
Read More:
hi