যোগ দর্শনে অষ্টাঙ্গ যোগের কয়টি ধাপ

ভারতীয় দর্শনের একটি আস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায় হল যোগ দর্শন। এই দর্শন থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ  বিষয় নিয়ে আজকে খুব সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হল।  ভারতীয় দর্শন প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে উপস্থাপন করাই হল এই পোস্ট এর উদ্দেশ্য।

যোগ দর্শনে অষ্টাঙ্গ যোগের কয়টি ধাপ
যোগ দর্শনে অষ্টাঙ্গ যোগের কয়টি ধাপ

 

 যোগ কী? যোগের বিভিন্ন পর্যায়গুলি সংক্ষেপে পাঠ্যপুস্তক অনুযায়ী আলোচনা করো।

 

যোগ কী ?

‘যোগ’ কথাটি সংস্কৃত ‘যুজ’ ধাতু থেকে এসেছে। যার আক্ষরিক অর্থ হলো—যুক্ত হওয়া, মিলন বা একত্র হওয়া। কিন্তু যোগ শাস্ত্রে যোগ মানে কোনো গাণিতিক যোগফল নয়, আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন বা সংযোগকে যোগ বলা হয়। অর্থাৎ বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের এবং বিভিন্ন বৃত্তির সুসংহত ও সুনিয়ন্ত্রিত বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধন করাই হলো যোগ।

​যোগ শাস্ত্র মহর্ষি পতঞ্জলি দ্বারা দ্বি-ধা বিভক্ত—

১) ক্রিয়া যোগ

২) অষ্টাঙ্গ যোগ

​ক্রিয়া যোগ:

তপশ্চর্যা, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান—এই তিনটির দ্বারা কোনো একটি বিশেষ লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়াকে ক্রিয়া যোগ বলা হয়।

​অষ্টাঙ্গ যোগ:

মহর্ষি পতঞ্জলি চিত্তবৃত্তিকে নিরোধ করার লক্ষ্যে যোগের আটটি স্তর বা অঙ্গের কথা বলেছেন। একেই অষ্টাঙ্গ যোগ বলা হয়। এই আটটি স্তর হলো—

১. যম, ২. নিয়ম, ৩. আসন, ৪. প্রাণায়াম, ৫. প্রত্যাহার, ৬. ধারণা, ৭. ধ্যান ,৮. সমাধি

​১. যম: 

যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “অহিংসাসত্যাস্তেয়ব্রহ্মচর্যাপরিগ্রহা যমাঃ” অর্থাৎ অহিংসা, সত্য, অস্তেয় (চুরি না করা), ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ—এই পাঁচটি অভ্যাসের দ্বারা মনের শুদ্ধি ঘটানো ও বাইরের জগত থেকে নিজেকে বিমুক্ত করার নামই হলো যম।

​২. নিয়ম:

নিয়মের অর্থ হলো শারীরিক ও মানসিক শৃঙ্খলার সাথে জীবন অতিবাহিত করা। শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান—এই পাঁচটি অভ্যাসের মাধ্যমে শরীর ও মনকে পবিত্র রাখার নামই হলো নিয়ম।

​২. নিয়ম:

যোগের দ্বিতীয় অঙ্গ হলো নিয়ম। যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “শৌচ-সন্তোষ-তপঃ-স্বাধ্যায়েশ্বরপ্রণিধানানি নিয়মাঃ।” অর্থাৎ শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রাণিধানকে বলা হয় নিয়ম।

​শৌচ: শৌচ বা শুচিতা দুই প্রকার—বাহ্যশুচিতা ও অভ্যন্তরীণ শুচিতা। বাহ্য শুচিতা হলো নিয়মিত স্নান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক, গৃহ পরিচ্ছন্ন ইত্যাদি। আর অভ্যন্তরীণ শুচিতা হলো সুচিন্তার অনুশীলন।

​সন্তোষ: সন্তোষ হলো হৃদয়ের তৃপ্তি। যা পাইনি তার জন্য ক্ষোভ না করে যা পেয়েছি তাতে সন্তুষ্টি লাভ।

​তপঃ: তপঃ বা তপস্যা হলো ব্রতচার ও সংযমশীলতার অনুশীলন। স্বল্পাহার, কখনো কখনো উপবাস, কোমলা শয্যায় শয়নত্যাগ, স্বপ্ননিদ্রা ইত্যাদি তপস্যার অন্তর্ভুক্ত।

​স্বাধ্যায়: স্বাধ্যায় হলো ধর্মতত্ত্বের অধ্যয়ন করা। গীতা, বেদব্যাস, উপনিষদ ইত্যাদির অধ্যয়নের দ্বারা বিষয়চিন্তা দূর হয় এবং আত্মজ্ঞান লাভের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়।

​ঈশ্বর প্রাণিধান: ঈশ্বর প্রাণিধান হলো নিজেকে ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করা। এর দ্বারা অহংকার দূরীভূত হয়। ঈশ্বর প্রাণিধান থেকে সমাধি সিদ্ধ হয়।

​৩. আসন:

যোগসূত্রে বলা হয়েছে “স্থিরসুখম্ আসনম্।” সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে স্থির রেখে সুখ ও সহজভাবে বসার নাম হলো আসন। দেহের সঙ্গে মনের সম্বন্ধ নিবিড়, তাই মনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন যোগাসন অভ্যাস একান্ত প্রয়োজন। যোগাসন অভ্যাসের দ্বারা দেহ ও মন সুস্থ সবল হয়, যা আত্মচিন্তায় মগ্ন হতে সাহায্য করে। তবে উপযুক্ত গুরুর নির্দেশ মতো যোগাসন করা একান্ত প্রয়োজন ।

৪. প্রাণায়াম

যোগসূত্রে বলা হয়েছে, প্রাণ বা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি সংযত করাকে প্রাণায়াম বলে। (তস্মিন্ সতি শ্বাসপ্রশ্বাসয়োঃ গতিবিচ্ছেদঃ প্রাণায়ামঃ)। অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি সংযত করাকে প্রাণায়াম বলা হয়। প্রাণায়াম ত্রিবিধ— শ্বাস ত্যাগ করে ভিতরের বায়ুকে বাইরে স্থাপন করার পদ্ধতিকে বাহ্যবৃত্তি বা রেচক বলে।  বাইরের বাতাস শ্বাসের দ্বারা গ্রহণ করে ভিতরে ধরে রাখাকে পূরক বলা হয় এবং শরীরের মধ্যে স্থির হয়ে সমগ্র শরীরকে বায়ুপূর্ণ করাকে বলে স্তম্ভবৃত্তি বা কুম্ভক। রেচক, পূরক ও কুম্ভক দ্বারা প্রাণায়াম সম্পন্ন হলে চিত্ত স্থির হয় এবং জীবনী শক্তিকে নিজের বশে আনে।

​৫. প্রত্যাহার

ইন্দ্রিয়গুলোকে তাদের নিজ নিজ বিষয় থেকে সরিয়ে এনে চিত্তের অনুগত করাই হলো প্রত্যাহার। ইন্দ্রিয়গুলি বহির্মুখী হলে চিত্তে চাঞ্চল্য দেখা দেয় এবং যোগসাধনায় বিঘ্ন ঘটে। ইন্দ্রিয়গুলি চিত্তের দ্বারা পরিচালিত হলে সাধকের বিষয়তৃষ্ণা দূর হয় এবং যোগসাধনা সম্ভব হয়। মহর্ষি পতঞ্জলি যোগসূত্রে বিভূতিবাদে ধারণা, ধ্যান ও সমাধি— এই তিনটি যোগাঙ্গকে একত্রে ‘সংযম’ বলেছেন।

​৬. ধারণা

যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “দেশবন্ধশ্চিত্তস্য ধারণা”। অর্থাৎ চিত্তকে কোন দেশে (স্থানে) ধরে রাখাকেই বলে ধারণা। চিত্তকে বাহ্য বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আবদ্ধ করা যায়। ইন্দ্রিয়ের প্রত্যাহার ও চিত্তশুদ্ধি ঘটলে চিত্তকে ভ্রূ-মধ্যে, নাভিচক্রে ও জিহ্বাগ্রে স্থাপন করাকেই ধারণা বলা হয়।

​৭. ধ্যান

যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “তত্র প্রত্যয়ৈকতানতা ধ্যানম্”। অর্থাৎ ধারণাতে জ্ঞানবৃত্তির একতানতাকেই ধ্যান বলে। অভ্যাসের দ্বারা যখন আমাদের চিন্তাপ্রবাহ অবিচ্ছিন্ন ধারায় চলে তখন তাকে ধ্যান বলে। অর্থাৎ ধ্যানের ক্ষেত্রে চিন্তাধারার মধ্যে কোন বিরতি বা বিচ্ছেদ হয় না।

​৮. সমাধি

যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “তদেবাতার্থমাত্রনির্ভাসং স্বরূপশূন্যমিব সমাধিঃ”। অর্থাৎ ধ্যান যখন ধ্যেয় বস্তু বা বিষয়ের আবেশে স্বরূপ শূন্য হয় তখন তাকে সমাধি বলা হয়। এক কথায় ধ্যান গভীর হলে সমাধি হয়।

উপরিউক্ত যোগ সম্প্ৰজ্ঞাত সমাধির উপযোগী, অসম্প্ৰজ্ঞাত সমাধি এই অষ্টাঙ্গযোগের লক্ষ্য নয়। যোগ মতে, সম্প্ৰজ্ঞাত সমাধির মাধ্যমে অসম্প্ৰজ্ঞাত সমাধিতে উন্নীত হওয়া যায়। সুতরাং বলা যায় উপরিউক্ত অষ্টাঙ্গযোগ সম্প্ৰজ্ঞাত সমাধির পথ প্রস্তুতকারক।


Thanks For Reading: যোগ দর্শনে অষ্টাঙ্গ যোগের কয়টি ধাপ।

Read More: