যোগ দর্শনে চিত্ত ও চিত্তভূমি

ভারতীয় দর্শনের একটি আস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায় হল যোগ দর্শন। এই দর্শন থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ  বিষয় নিয়ে আজকে খুব সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হল। প্রশ্নটি হল-যোগ দর্শনে চিত্ত  বলতে কী বোঝ? বিভিন্ন প্রকার চিত্তভূমির ব্যাখ্যা করো। প্রসঙ্গে বিভিন্ন সমাধির পরিচয় দাও। দর্শনে অনার্স ও জেনেরাল সকল ছাত্রছাত্রীদের জন্য এবং সকল দর্শন আনুরাগীদের জন্য ভারতীয় দর্শন প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে উপস্থাপন করাই হল এই পোস্ট এর উদ্দেশ্য।

যোগ দর্শনে চিত্ত ও চিত্তভূমি
যোগ দর্শনে চিত্ত ও চিত্তভূমি

 

যোগ দর্শনে চিত্ত  বলতে কী বোঝ? বিভিন্ন প্রকার

চিত্তভূমির ব্যাখ্যা করো। প্রসঙ্গে বিভিন্ন সমাধির পরিচয় দাও। 

যোগ দর্শনে চিত্ত  

সাংখ্য মতের, মন, বুদ্ধি ও অহংকার এই ৩টি তত্বকে একত্রে যোগ দর্শনে চিত্ত  বলা হয়েছে, এই ৩টি তত্ত্ব জড় প্রকৃতির পরিণাম। তাই চিত্ত  হলো জড় ও অচেতন। পুরুষ বা আত্মা চৈতন্য স্বরূপ। এই পুরুষ বা আত্মা চিত্তে প্রতিফলিত হলে তখন চিত্ত  চেতন রূপে অভিহিত হয়। চৈতন্য স্বরূপ আত্মা চিত্তে প্রতিফলিত হলে প্রতিফলিত আত্মা চিত্তের বিকারকে নিজের বিকার বলে মনে করে। কোন গতিশীল তরঙ্গে চন্দ্রের আলো যেমন গতিশীল বলে মনে হয়, তেমনই অচেতন চিত্তে আত্মা প্রতিফলিত হলে চিত্ত ও গতিশীল হয়।

চিত্তভূমি

‘চিত্তস্য মহ্যাবস্থাঃ’ অর্থাৎ যোগ মতে, চিত্তের সহজ ও স্বাভাবিক অবস্থাই হলো চিত্তভূমি। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের তারতম্য অনুসারে চিত্ত  নানারুপ ধারণ করে। চিত্তের বিভিন্ন স্তর বা অবস্থাসমূহকে চিত্তভূমি। মহর্ষি পতঞ্জলির মতে চিত্ত ভূমি পাঁচ প্রকার-

1.ক্ষিপ্ত

যে ভূমিতে চিত্ত  স্বভাবতই অত্যন্ত অস্থির তাকে ক্ষিপ্ত বলা হয়। ক্ষিপ্ত অবস্থায় চিত্ত  রজঃ ও তম গুণের প্রভাবে বিভিন্ন বিষয়ে ধাবিত হলেও, একটি বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী থাকতে পারেনা। ক্ষিপ্ত চিত্তের ব্যক্তির পক্ষে তত্ত্ব চিন্তা পুরুষ প্রকৃতি বা যোগ সাধনা কোনভাবেই সম্ভব নয়। সংসারের অধিকাংশ চিত্তের অবস্থাই এরূপ।

2. মূঢ়

যখন রাগ ও মোহের বশীকৃত চিত্তের অবস্থাকে মূঢ়ভূমি বলে, এই অবস্থায় তমঃ গুণের প্রাধান্য থাকায় চিত্ত নিষ্ক্রিয়, মোহাচ্ছন্ন, তন্দ্রা, আলস্য ও অধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এই অবস্থায় চিত্ত ভালো মন্দ বিচার করতে সমর্থ হয়না। চিত্তের এই অবস্থাকে কিং কর্তব্য বিমূঢ় অবস্থাও বলা হয়।

3.বিক্ষিপ্ত

চিত্তের তৃতীয় ভূমি হলো বিক্ষিপ্ত। বিক্ষিপ্ত অবস্থায় চিত্ত তমো গুণের প্রাধান্য না থাকায় এবং রজোগুণের আংশিক প্রভাব থাকায় চিত্ত কিছুক্ষণের জন্য একটি বিষয়ে নিবিষ্ট হতে পারে। এই অবস্থায় চিত্ত স্বল্প কালের জন্য কোন বিষয়ে নিবিষ্ট হলেও, রজঃ গুণের প্রাধান্যের জন্য পরমুহূর্তেই অন্য বিষয়ে ধাবিত হয়।

৪. একাগ্র

এই অবস্থায় চিত্তে রজঃ ও তমঃ গুণের প্রভাব লুপ্ত হয় এবং সত্ত্ব গুণের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এই অবস্থায় চিত্ত কোন একটি বিষয়ের প্রতি একাগ্র হয়। যেমন স্থির দীপশিখার ন্যায় মন এক অবস্থায় স্থির থাকে। এই অবস্থায় চিত্ত একনিষ্ঠ বিষয়ে ধ্যানমগ্ন হয় এবং ধ্যানের বিষয় ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে চিত্তে থাকেনা। এই অবস্থায় চিত্তের চিত্ত ভূমি সম্পূর্নভাবে নিরুদ্ধ হয়ে সমাধিস্ত হয়, যাকে ‘সম্প্রজ্ঞাত সমাধি’ বলে। এই অবস্থায় যোগী নিজের দেহ ও বাহ্য জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে।

৫. নিরুদ্ধ

যে অবস্থায় চিত্তের চিত্তবৃত্তি সম্পূর্নভাবে নিরুদ্ধ হয় তাকে নিরুদ্ধ চিত্তভূমি বলে। এই চিত্তভূমিতে পুরুষ স্বরুপে অবস্থান করে – ‘তদা দ্রষ্টুঃ স্বরূপে অবস্থানম’। এই অবস্থায় যোগী যে সমাধি লাভ করে তাকে ‘অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি’ বলা হয়। এই ভূমিতে আত্মা স্ব স্ব স্বরূপে অবস্থান করে।

  • উপরিউক্ত ৫ প্রকার চিত্তভূমির মধ্যে ক্ষিপ্ত, মূঢ় ও বিক্ষিপ্ত – এই ৩ অবস্থায় যোগ সম্ভব নয়। একাগ্র অবস্থা যোগের অনুকূল এবং নিরুদ্ধ ভূমিতেই একমাত্র যোগ সম্ভব।

বিভিন্ন সমাধির পরিচয়

মহর্ষি পতঞ্জলির মতে চিত্তবৃত্তির নিরোধই হলো সমাধি। সমাধি দুই প্রকার – সম্প্রজ্ঞাত ও অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি। যোগ মতে, অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা চিত্তবৃত্তির নিরোধ হলে প্রথমে সম্প্রজ্ঞাত সমাধি হয়। এই অবস্থায় চিত্ত একটি বিষয়ে নিবিষ্ট হয়, তবে এই অবস্থায় চিত্তবৃত্তি অবলুপ্ত হয়না। মহর্ষি পতঞ্জলী ও ব্যাসদেব সম্প্রজ্ঞাত সমাধিকে ৪ ভাগে ভাগ করেছেন : সবিতর্ক, সবিচার, সানন্দ ও সাস্মিত।

সবিতর্ক – যে সমাধিতে ধ্যানের স্থূল বিষয়ের সাক্ষাৎকার হয় তাকে সবিতর্ক সমাধি বলে। এই সমাধিতে চিত্ত দেব-দেবীর স্থূল মূর্তিতে নিবিষ্ট হয় এবং ওই মূর্তির সাক্ষাৎকার হয়।

সবিচার – যে সমাধিতে স্থূল বস্তু থেকে সূক্ষ্ম বিষয়কে ধ্যানের বিষয় করা হয় তাকে সবিচার সমাধি বলে। এই স্তরের বিষয়ে সূক্ষ্ম কারণ প্রকৃতি, মহৎ তত্ত্ব, অহংকার, পঞ্চতন্মাত্র প্রভৃতির প্রত্যক্ষ হয়।

সানন্দ – সমাধির এই স্তরে ইন্দ্রিয়সমূহ ধ্যানের বিষয় হয়। এই স্তরে ইন্দ্রিয়সমূহকে রজঃ ও তম দোষমুক্ত রূপে চিন্তা করা হয়। এই স্তরে যোগীর চিত্তে সত্ত্ব গুণের উৎকর্ষ হওয়ায় চিত্তে আনন্দ উৎপন্ন হয়।

সাস্মিত – সাস্মিত সমাধি সম্প্রজ্ঞাত সমাধির সর্বোচ্চ স্তর। অস্মিতা বা অহংকার ইন্দ্রিয় সমূহের সূক্ষ্ম রূপ। এই অবস্থায় অহংকার এবং পুরুষ একই ভূত হয়ে গেছে হয় অর্থ্যাৎ অহংকারকে পুরুষ বলে ভ্রান্তি হয়।

  • উপরিউক্ত সকল প্রকার সমাধি সবীজ সমাধি, কারণ এই সকল সমাধিতে সংসার বীজ সম্পূর্ন রূপে বিনষ্ট হয়না, সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়।
  • সম্প্রজ্ঞাত সমাধির দ্বারা চিত্ত মন বিভিন্ন চিন্তা থেকে মুক্ত হয় তখন তাকে অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি বলে। অসম্প্রজ্ঞাত সমাধির বর্ণনায় যোগসূত্রে বলা হয়েছে – ‘বিরাম প্রত্যয়াভ্যাসপূর্বঃ সংস্কারশেষোহন্যঃ’ অর্থ্যাৎ

অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি হলো পরবৈরাগ্যের অভ্যাসের দ্বারা সংস্কার শেষরূপে সমাধি। এই অবস্থায় বিষয়ের কোন অস্তিত্ব থাকেনা তাই এই সমাধিকে নির্বীজ সমাধি বলা হয়। অসম্প্রজ্ঞাত সমাধিতে পুরুষ প্রকৃতির সকল প্রকার সংযোগ ছিন্ন করে সস্বরূপে অবস্থান করে। প্রকৃতির বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পুরুষ জন্ম-মরণ ও সুখ-দুঃখকে অতিক্রম করে কৈবল্য প্রাপ্ত হয়।

চিত্তবৃত্তি নিরোধ :

ক্ষিপ্ত, মূঢ়, বিক্ষিপ্ত, একাগ্র ও নিরুদ্ধ এই পঞ্চবিধ চিত্তভূমির শেষোক্ত দুটি ভূমি যোগানুকূল। তবে এই দুই ভূমি যোগানুকূল হলেও যোগপ্রক্রিয়া অতি জটিল। একাগ্র অবস্থায় বিষয়মাত্র অবশিষ্ট থাকায় চিত্তের পরিপূর্ণ লয় সম্ভব হয় না। নিরুদ্ধ অবস্থায় চিত্তের পরিপূর্ণ লয় হয় এবং পুরুষ স্বস্বরূপে অবস্থান করে। একাগ্র অবস্থা থেকে চিত্তের পূর্ণলয়ের অবস্থা পর্যন্ত যোগের অনেকগুলি পর্যায় বর্তমান। যোগের বিভিন্ন পর্যায় অনুযায়ী যোগের নানা প্রকারভেদ যোগদর্শনে স্বীকৃত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে যোগ দ্বিবিধ : সম্প্রজ্ঞাত ও অসম্প্রজ্ঞাত।

১. সম্প্রজ্ঞাত সমাধি :

যোগমতে অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা চিত্তবৃত্তির নিরোধ হয়। অন্য সব উপায় এই উপায়দ্বয়ের অন্তর্গত। গীতাতেও বলা হয়েছে, “অভ্যাসেন হি কৌন্তেয় বৈরাগ্যেন চ গৃহ্যতে” (৬/৩৫)। বৈরাগ্যের দ্বারা বিষয়স্রোত মন্দীভূত হয় এবং অভ্যাসের দ্বারা বিবেকস্রোত উদ্ঘাটিত হয়। এই উপায়দ্বয়ের দ্বারা যে প্রথম যোগ বা সমাধিপ্রাপ্তি ঘটে তাকেই সম্প্রজ্ঞাত সমাধি বলা হয়। যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “বিতর্কবিচারানন্দাস্মিতারূপানুগমাৎ সম্প্রজ্ঞাতঃ”—সমাধিপাদ – ১৭। অর্থাৎ বিতর্ক, বিচার, আনন্দ ও অস্মিতা এই ভাবচতুষ্টয়ানুগত সমাধি হ’ল সম্প্রজ্ঞাত সমাধি।

‘সম্প্রজ্ঞাত’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হ’ল সম্যক্ বা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত। এই অবস্থায় ধ্যেয় বস্তুকে সম্যক্ভাবে জানা যায় বলে এই সমাধিকে সম্প্রজ্ঞাত বলে। যোগাভ্যাসের প্রাথমিক স্তরে কোন স্থূল দেবমূর্তি বা ভৌতিক পদার্থকে অবলম্বন করে অগ্রসর হতে হয়। স্থূলবস্তু থেকেই ক্রমশঃ সূক্ষ্ম বস্তুর দিকে চিত্ত প্রবাহিত হয়। সমাধির বিষয়। তাই যোগমতে ধ্যেয় বা ভাব্য বস্তু দ্বিবিধঃ স্থূল ও সূক্ষ্ম। এই দ্বিবিধ বস্তুই আবার বাহ্য ও আন্তর ভেদে দ্বিবিধ।

সুতরাং মোট চার প্রকার ধ্যেয়বস্তু বর্তমান : (১) স্থূল বাহ্যবস্তু, যেমন, ক্ষিত্যাদি পঞ্চভূত, (২) স্থূল আন্তরবস্তু, যেমন,

৫. অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি 

সম্প্রজ্ঞাত সমাধির দ্বারা চিত্ত যখন বিষয় চিন্তা থেকে মুক্ত হয় তখন অসম্প্রজ্ঞাত সমাধির উদয় হয়। অসম্প্রজ্ঞাত সমাধির বর্ণনায় যোগসূত্রে বলা হয়েছে— “বিরামপ্রত্যয়াভ্যাসপূর্বঃ সংস্কারশেষোহন্যঃ—(সমাধিপাদ-১৮)। অর্থাৎ অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি হ’ল পরবৈরাগ্যের অভ্যাসের দ্বারা সংস্কার শেষ স্বরূপ সমাধি। সকলপ্রকার চিত্তবৃত্তির নিরোধকে বলা হয় বিরাম। এই বিরাম লাভের উপায় হ’ল বৈরাগ্য। অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি। বৈরাগ্যের দ্বারা চিত্তবৃত্তিসমূহ নিরুদ্ধ হয়। অভ্যাসের দ্বারা এই বৈরাগ্য দৃঢ় হয়। বৈরাগ্য দৃঢ় হ’লে চিত্তবৃত্তির পুনরুৎপত্তির সম্ভাবনা থাকে না। চিত্ত তখন দগ্ধবীজের ন্যায় শক্তিশূন্য হয়ে পড়ে। ‘অসম্প্রজ্ঞাত’ শব্দের অর্থ হ’ল যে অবস্থায় বিষয়ের কোন অস্তিত্ব থাকে না (ন কিঞ্চিৎ প্রজ্ঞায়তে ইতি অসম্প্রজ্ঞাতঃ)। এইরূপ নিরালম্ব ও নির্বীজ সমাধিকে বলা হয় অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি।


Thanks For Reading: যোগ দর্শনে চিত্ত ও চিত্তভূমি। 

Read More: