ভারতীয় দর্শনের(indian philosophy ) একটি আস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায় হল যোগ দর্শন।ভারতীয় দর্শন প্রশ্ন উত্তর পর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আজকে খুব সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হল। প্রশ্নটি হল-যোগ দর্শনে চিত্তবৃত্তি কাকে বলে? চিত্তবৃত্তির প্রকারভেদ গুলি কি কি?

যোগ দর্শনে চিত্তবৃত্তি কাকে বলে? চিত্তবৃত্তির প্রকারভেদ গুলি কি কি?
যোগ দর্শনে চিত্তবৃত্তি
যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “বিসয়সম্বন্ধাৎ চিত্তস্য পরিণাম-বিশেষঃ বৃত্তয়ঃ। অর্থাৎ চিত্তবৃত্তি হলো- বিষয়ের সাথে ইন্দ্রিয়ের সংযোগের ফলে চিত্তের যে বিষয় আকারের পরিণতি তাই চিত্তের বৃত্তি। যোগ দর্শন মতে, মনের মাধ্যমে চিত্ত যখন কোন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন চিত্ত সেই বিষয়ের আকার গ্রহণ করে এবং সেই বিষয়ের জ্ঞান হয়। চিত্তের এই বিষয় আকার গ্রহণই চিত্তবৃত্তি। চিত্ত যখন মন ও ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ঘটের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন চিত্ত ঘটাকার ধারণ করে এবং ঘটের জ্ঞান হয়।
যোগদর্শনে চিত্তবৃত্তি ক্লিষ্ট ও অক্লিষ্ট ভেদে দুই প্রকার। যে বৃত্তি কর্মসংস্কারের দ্বারা ক্লিষ্ট তাকে ক্লিষ্ট বৃত্তি বলে। আর যে বৃত্তির মূলে বিবেক জ্ঞান থাকে তাকে অক্লিষ্ট বৃত্তি বলে। সাংখ্য মতে, বন্ধ অবস্থায় আত্মা অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ, অভিনিবেশ এই পঞ্চক্লেশে ক্লিষ্ট হয়। এই পঞ্চক্লেশ যে বৃত্তির মধ্যে থাকে তাদের বলা হয় ক্লিষ্টবৃত্তি।
চিত্তবৃত্তির প্রকারভেদ
যোগশাস্ত্র মতে, চিত্তবৃত্তি পাঁচ প্রকার- “প্রমা-বিপর্যয়-বিকল্প-নিদ্রা-স্মৃতয়ঃ। অর্থাৎ i. প্রমাণ, ii. বিপর্যয়, iii. বিকল্প, iv. নিদ্রা ও v. স্মৃতি।
প্রমাণঃ-
প্রমাণ হল যথার্থ জ্ঞান বা বৃত্তি। সাংখ্য দর্শনের ন্যায় যোগদর্শনে তিনটি প্রমাণের উল্লেখ করা হয়েছে- প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দ। ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বাহ্য কোন বিষয়ের সংযোগের ফলে চিত্তে বৃত্তিকে প্রত্যক্ষবৃত্তি বলে। প্রত্যক্ষবৃত্তি দুই প্রকারের- বাহ্যপ্রত্যক্ষবৃত্তি ও আনুমানিকবৃত্তি(। ইন্দ্রিয়ের সাথে মনের সংযোগে চিত্তের বৃত্তিকে বলে প্রত্যক্ষ বৃত্তি এবং মনের সুখ, দুঃখ, বেদনা ইত্যাদির ফলে চিত্তের বৃত্তিকে অন্তঃপ্রত্যক্ষ বৃত্তি বলে।
হেতু দেখে সাধ্যের অনুমান – এ হল অনুমান বৃত্তি। কোন শ্রোতার শব্দ শুনে চিত্তের বৃত্তি শব্দবৃত্তি।
বিপর্যয় :-
“বিপর্যয়ো মিথ্যাজ্ঞানমৎ।”- বিপর্যয় হল একপ্রকার ভ্রান্ত জ্ঞান। যে বস্তু স্বরূপত যেরূপ তাকে সেই রূপে না জেনে অন্যভাবে জানলে মিথ্যা জ্ঞান হয়। মিথ্যাজ্ঞানের ফলে চিত্তবৃত্তি বিষয়ের অনুকরণ না হয়ে ভিন্ন রূপ রূপ হয়। যেমন- রজ্জুতে সর্প দর্শন মিথ্যা জ্ঞান। এক্ষেত্রে চিত্তবৃত্তি রজ্জু না হয়ে সর্প বিষয়ে জ্ঞান হয়। সংশয় একপ্রকার বিপর্যয়।
বিকল্প :-
“শব্দজ্ঞানানুপাতী বস্তুশূন্যো বিকল্পঃ।”- অর্থাৎ যে জ্ঞান কেবল শব্দাশ্রয়ী, শব্দের অর্থ অনুসারে কোন বস্তু থাকেনা, সেই বৃত্তি বা বিষয় জ্ঞানকে ‘বিকল্প’ বলে। যেমন- আকাশ কুসুম, শশশৃঙ্গ। বস্তুগত কোন কিছু না থাকলেও এসব শব্দ শুনে চিত্তের একপ্রকার বিকার ঘটে।
নিদ্রা :-
যোগ দর্শনে নিদ্রাকেও একপ্রকার চিত্তবৃত্তি বলা হয়েছে। নিদ্রাকালে চিত্তে তমো গুণের আতিথ্য ঘটে। ফলে ঐ সময় অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞান হয় না। গভীর নিদ্রাকালে জ্ঞানের অভাবের জ্ঞান হয়। তাই নিদ্রা ভঙ্গের পর আমরা বলতে পারি – “আমায় এমন গভীর ঘুম হয়েছিল যে আমার কোন জ্ঞান ছিলনা।” জ্ঞান ছিলনা এমন অনুভব ও জ্ঞান। তাই যোগশাস্ত্র মতে নিদ্রাকালে জ্ঞানের অভাবের চিত্তবৃত্তি হয়।
স্মৃতি :-
স্মৃতি একপ্রকার চিত্তবৃত্তি। অতীত অভিজ্ঞতার সংস্কারজনিত বৃত্তি হল স্মৃতি। পূর্বে যা প্রত্যক্ষকালে চিত্ত ঘটাক্ষর বৃত্তি গ্রহণ করেছিল, তাই বর্তমানে ঘট সামনে না থাকলেও ঘটাকার বৃত্তির পুনরুদ্রেক হয়।
Thanks For Reading: যোগ দর্শনে চিত্তবৃত্তি কয় প্রকার ও কি কি।
Read More: