সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতির স্বরূপ ও তার অস্তিত্ব

ভারতীয় দর্শনের প্রাচীনতম শাখাগুলোর মধ্যে সাংখ্য দর্শন (Samkhya Philosophy) অন্যতম। মহর্ষি কপিলকে এই দর্শনের আদি প্রবর্তক বলা হয়।  আজকের এই সাংখ্য দর্শন প্রশ্ন উত্তর পর্বে আমাদের আলোচ্য বিষয় হল- সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতির স্বরূপ ও তার অস্তিত্বের প্রতিপাদক যুক্তি দাও।

সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতির স্বরূপ ও তার অস্তিত্ব
সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতির স্বরূপ ও তার অস্তিত্ব

 

সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতির স্বরূপ ও তার অস্তিত্বের প্রতিপাদক যুক্তি দাও।

 

প্রকৃতির স্বরূপঃ

ভূমিকাঃ

সাংখ্য দর্শন পরিনামবাদী সৎকার্যবাদীর উপর ভিত্তি করেই সাংখ্যদের প্রকৃতি পরিনামবাদ গড়ে উঠেছে। তাদের মতে জগৎ প্রকৃতির পরিনামমাত্র। এমন দেখা যাক সাংখ্য মতে, প্রকৃতির স্বরূপ কী ?

প্রকৃতির ব্যুৎপত্তিগত অর্থঃ

‘প্রকৃতি’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল – “যা তত্ত্বান্তরের উৎপাদন স্বরূপ কার্য সাধন করে, যে করে কিন্তু কখনই কৃত হয়না, তাই প্রকৃতি। ”অর্থাৎ ‘প্রকরোতি ইতি প্রকৃতি’। ‘প্রক্রিয়তে অনেন সর্বং’ – অর্থাৎ যার দ্বারা সকল জগৎ সৃষ্ট হয়, তাকে প্রকৃতি বলে।

প্রকৃতির স্বরূপ হলঃ

সাংখ্য মতে, প্রকৃতি হলো জগতের আদি কারণ। এর স্বরূপ বুঝতে গেলে নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করা প্রয়োজন:

 ১. ত্রিগুণাত্মিকা:

‘সত্ত্ব রজস্তমসাং সাম্যাবস্থা প্রকৃতি’ – অর্থাৎ সত্ত্ব , রজঃ ও তমঃ – এই তিন গুণের সাম্যাবস্থা বা সদৃশ পরিমানে অবস্থানকে প্রকৃতি বলে। এছাড়া প্রকৃতির পৃথক কোন সত্ত্বা নেই। এই ত্রিগুণের সাম্যাবস্থার কিছুমাত্র বিকার বা বৈষম্য দেখা দিলে তাকে আর প্রকৃতি বলা যাবেনা।

২. প্রকৃতি নিত্য

প্রকৃতি অন্যসব তত্ত্বের উপাদান, কিন্তু অন্য তত্ত্বের কার্য নয়। তাই সাংখ্যকারিকাতে বলা হয়েছে – ‘মূল প্রকৃতিঃ অবিকৃতিঃ।’ অর্থাৎ প্রকৃতির আর কোন মূল কারণ নেই। তাই প্রকৃতি নিত্য।

৩. ত্রিনগুণের সাম্যাবস্থা

ত্রিনগুণের সাম্যাবস্থার অবিকৃতি হল প্রকৃতি। যেহেতু প্রকৃতির মূল প্রকৃতি। প্রকৃতি নিত্য। তাই প্রকৃতি উৎপত্তি বিনাশ রোহিত । দৃশ্যমান জগতের কারণ আছে। এভাবে চলতে থাকলে অনাবস্থা দোষ ঘটে। এই দোষ বারণের জন্য প্রকৃতিকে জগতের মূল কারণ বলা হয় – ‘মূলে মূলাভাবাৎ অমূলং মূলং।’

৪.এক ও নিত্য:

প্রকৃতি নিত্যং ও স্বয়ংম্ভূ , প্রকৃতি বহু নয়, প্রকৃতি এক। প্রকৃতি চেতন নয়, প্রকৃতি জড়। সৃষ্টির আগে জগৎ অব্যক্ত অবস্থায় প্রকৃতির মধ্যে থাকে বলে প্রকৃতিকে অব্যক্ত বলা হয়। প্রকৃতি ব্যাপক, বিভু, সর্বগত, অতএব বৃহৎ ও মহৎ।

৫.প্রসবধর্মী:

প্রকৃতি থেকেই সমস্ত মহদাদি তত্ত্বের (বুদ্ধি, অহংকার ইত্যাদি) জন্ম হয়। তাই প্রকৃতিকে ‘প্রসবধর্মী’ বলা হয়।

সুতরাং সাংখ্য মতে, প্রকৃতি এক নিত্য, স্বয়ংম্ভূ, নিরবয়ব ও নির্বিশেষ।

প্রকৃতির অস্তিত্ব প্রতিপাদক প্রমাণ

সাংখ্য কারিকাদের মতে, প্রকৃতি প্রত্যক্ষ গোচর নয়, প্রকৃতির অস্তিত্ব অনুমানের দ্বারাসিদ্ধ হয়। ‘কার্যতঃ তদুপলব্ধেঃ।’ অর্থাৎ কার্যরূপ হেতুর দ্বারা প্রকৃতির উপলব্ধি হয়। মহৎ তত্ত্ব থেকে আরম্ভ করে পঞ্চভূত পর্যন্ত সব পদার্থহ কার্য। এই কার্য সমূহের কারণ হল প্রকৃতি।

ঈশ্বরকৃষ্ণ তাঁর ‘সাংখ্যকারিকা’গ্রন্থে প্রকৃতির অস্তিত্ব প্রতিপাদন করতে গিয়ে বলেছেন –

“ভেদানাং পরিমাণাৎ সমন্বয়াৎ শক্তিঃ প্রবৃত্তেশ্চ।

কারণ কার্য বিভাগাৎ অবিভাগাৎ বৈশ্বরূপ্যস্য। ”

প্রকৃতির অস্তিত্ব সাধক ৫ টি হেতু হল –

i.ভেদানাং পরিমানাৎ (উৎপন্ন বস্তুর সীমাবদ্ধতা):

মহৎ বা বুদ্ধি থেকে ক্ষিতি পর্যন্ত জগতের যাবতীয় বস্তু ভেদবিশিষ্ট ও পরিমিত। মহৎ , অহংকার, তন্মাত্র সবই ব্যক্ত পদার্থ। মাত্রই তার কারণ আছে, যেহেতু তারা অনিত্য বা অব্যাপী। পৃথিবীর কারণ তন্মাত্র, তন্মাত্রের কারণ অহংকার, অহংকারের কারণ মহৎ বা বুদ্ধি। তবে মহৎ তত্ত্ব এর কারণ নেই একথা বলা যাবেনা। তাই মহৎ তত্ত্বের কারণ হিসেবে অব্যক্ত প্রকৃতি স্বীকৃত।

(ii) সমন্বয়াৎ (সাদৃশ্য বা সমন্বয়):

সমন্বয় বা প্রকৃতির একরূপতা থেকেও প্রকৃতির অস্তিত্ব অনুমতি হয়। মহাভূত, তন্মাত্র, অহংকার, মহৎ তত্ত্ব পরস্পর ভিন্ন হলেও সুখ, দুঃখ মোহজনক। সত্ত্ব, রজঃ তম্‌ – এই ত্রিগুন সুখ দুঃখের মোহজনক। এই সকল তত্ত্বের প্রত্যেকটিতে সুখ দুঃখ মোহ জনকতা সমানভাবে থাকায় ত্রিগুণাত্মক অব্যক্ত প্রকৃতি এদের কারণ হিসাবে অবশ্য স্বীকার্য।

(iii) শক্তিতঃ প্রবৃত্তেশ্চ (সামর্থ্য বা শক্তি):

সাংখ্য সৎ কার্যবাদ অব্যক্ত শক্তি রূপে বিদ্যমান। তিলের মধ্যে তেল উৎপাদক শক্তি অব্যক্ত রূপে থাকে বলেই তিল থেকে তেল উৎপন্ন হয়। মহৎতাদি কার্য নিজ নিজ কারনে অব্যক্ত অবস্থায় থাকে। সেই জন্য স্বীকার করতে হয় এইসব কারনে শক্তি আছে। এই শক্তি কারনে স্থিত কার্যেরই অব্যক্ত অবস্থা। তাই শক্তির চরম আশ্রয় হিসাবে অব্যক্ত প্রকৃতির অস্তিত্ব স্বীকার করতে হয়।

(iv) কারণ কার্যবিভাগাৎ (কারণ ও কার্যের পার্থক্য):

ব্যক্ত পদার্থের বা কার্যের উৎপত্তি থেকেও চরম কারণ রূপে অব্যক্ত প্রকৃতির অস্তিত্ব সিদ্ধ হয়। সাংখ্য মতে, কারণ থেকে কার্যের উৎপত্তি হল বিভাগ। তবে বিভাগের অর্থ এই নয় যে, কারণ থেকে নতুন কোন কিছুর উৎপত্তি হল। বিভাগের অর্থ হল কারণ থেকে কার্য কেবলমাত্র ব্যক্তরূপে প্রকটিত হয়। যেমন – কচ্ছপের অঙ্গগুলি আবরণ থেকে নির্গত হলে ভিন্ন রূপে প্রতীত হয়। সুতরাং পরিনাম প্রাপ্ত জগতের সকল বিষয়ের সঙ্গে যে উপাদান কারণ একই সঙ্গে ভিন্ন ও অভিন্ন রূপে বর্তমান তাই প্রকৃতি।

(v) অবিভাগাৎরৈশ্বরূপস্য  (প্রলয় বা বিলয়):

ব্যক্ত পদার্থের বিনাশ থেকেও তার এক অব্যক্ত সৎ কারণ সিদ্ধ হয়। বিনাশ বলতে নিজ কারনে লীন হয়ে যাওয়া। বিনাশ কালে মহৎ তত্ত্ব প্রভৃতি অব্যক্ত প্রাপ্ত হয়। যেমন – ঘট ধ্বংসের পর মৃত্তিকায় পরিণত হয়। এই প্রকৃতিতে সব কার্য অব্যক্ত অবস্থায় থাকে। তাই প্রকৃতি সব কার্যের চরম অব্যক্ত অবস্থা। সুতরাং , চরম অব্যক্ত প্রকৃতির অস্তিত্ব অবশ্য স্বীকার্য্য।

 উপসংহারঃ

সাংখ্য দর্শনের এই যুক্তিগুলো মূলত ‘সৎকার্যবাদ’ (কার্য কারণের মধ্যে পূর্বেই বিদ্যমান থাকে) মতবাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। সাংখ্য আচার্যদের মতে, জগত একটি বিন্যাস বা ব্যবস্থা, আর এই ব্যবস্থার পেছনে একটি অবিনশ্বর, অচেতন কিন্তু সক্রিয় আদি কারণ থাকা যুক্তিযুক্ত, যাকে তারা ‘প্রকৃতি’ বা ‘প্রধান’ বলে অভিহিত করেছেন।


Thanks For Reading:  সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতির স্বরূপ ও তার অস্তিত্ব।

Read More: