বৌদ্ধ দর্শনে ‘ব্রহ্মবিহার’ হলো আধ্যাত্মিক উন্নতির চারটি উচ্চতর মানসিক অবস্থা বা গুণাবলি। ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ শ্রেষ্ঠ বা পবিত্র এবং ‘বিহার’ শব্দের অর্থ হলো বাস করা বা অবস্থান করা। অর্থাৎ, মনকে যখন এই চারটি পবিত্র অবস্থায় অভ্যস্ত করা হয়, তাকেই ব্রহ্মবিহার ভাবনা বলা হয়। এই চারটি ভাবনাকে একত্রে ‘চতুরার্য ব্রহ্মবিহার’ বলা হয়।

ব্রহ্মবিহার ভাবনা |বৌদ্ধ দর্শন
=> গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন মানুষের জীবন দুঃখময়। তবে দুঃখ চিরকালীন নয়, দুঃখের নিবৃত্তি সম্ভব, দুঃখের নিবৃত্তির জন্য বুদ্ধ চর্তুথ আর্য সত্যের উল্লেখ করেছেন, চর্তুথ আর্যসত্যে দুঃখ মুক্তির মার্গ বা পথের উল্লেখ রয়েছে। এই মার্গ বৌদ্ধদর্শনে অষ্টাক্ষিক [অষ্টাঙ্গিক] মার্গ নামে পরিচিত।
আষ্টি [অষ্টাঙ্গিক] মার্গ হল
i) সম্যক দৃষ্টি, ii) সম্যক সংকল্প, iii) সম্যক বাক্ [বাক], iv) সম্যক কর্ম, v) সম্যক আজীব, vi) সম্যক ব্যায়াম, vii) সম্যক সম্যক স্মৃতি ও viii) সম্যক সমাধি।
এই আষ্টি [অষ্টাঙ্গিক] বা আষ্টি [অষ্টাঙ্গিক] মার্গের মধ্যে প্রথম সাতটি যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হলে সাধিকের মনে প্রীতি, করুণা, মুদিতা ও উপিক্ষার [উপেক্ষার] ভাব জাগ্রত হয় এবং তখন সাধিক কোন বিষয়ে একাগ্র চিত্ত হয় অর্থাৎ সাধিকের চিত্ত পরমসত্তা ব্রহ্মের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। সাধিক এক অনাবীল [অনাবিল] আনন্দে বিরাজ করে। ব্রহ্মবিহার ভাবনা কথাটি বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। যেমন- ব্রহ্মের বসবাসস্থল, স্বর্গীয় অবস্থা, প্রেম অবস্থা প্রভৃতি। ‘ব্রহ্মবিহার’ শব্দটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ব্রহ্ম + বিহার = ব্রহ্মবিহার ব্রহ্ম বলতে পরম বা আনন্দময় সত্তা এবং বিহার বলতে বসবাসস্থল বা পরম সত্তার মধ্যেই বসবাস অর্থাৎ ব্রহ্মবিহার শব্দের অর্থ হল আনন্দময় পরম সত্তার সাথে একাত্ম হয়ে থাকা বা উপলব্ধি করা।
ভাবনা’ শব্দটির অর্থ হল জীবনে কঠোর নিয়ম পালন অর্থাৎ সাধিক কে ব্রহ্মবিহারে অবস্থান করতে হলে মূলত চারটি গুণাবলি সম্যক ভাবে পালন করতে হবে। এই চারটি গুণাবলি হল —1. মিত্রী বা মেত্তা, ii) করুণা, iii) মুদিতা ও iv) উপেক্ষা।
এই গুলি বৌদ্ধদের জীবন চর্চায় এক কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করে আছে। শুধু তাই নয় বৌদ্ধ ধর্মের মানসিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এক প্রাথমিক আবশ্যিক কর্তব্য হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।
1. মিত্রী বা মেত্তা =>
‘মেত্তা’ কথাটির আভিধানিক অর্থ হল বন্ধুত্ব পূর্ণতা। তবে মেত্তা কথাটিকে ভালোবাসা অর্থে গ্রহণ করলে তার দ্বারা কেবল সত্যতা প্রকাশে কেননা পালি ভাষায় যাকে ‘প্রেম’ বা ‘ভালোবাসা’ বোঝায় সত্যতা ওটা সমর্থক কিন্তু ওর সাথে জড়িয়ে আছে আসক্তি, যা মেত্তার তাৎপর্যের একেবারে বিরোধী। মূলত মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে মেত্তা নৈর্ব্যক্তিক অবস্থা যা মন্দ ইচ্ছার বিপরীতে ইতিবাচক অবস্থাকে বুঝিয়ে থাকে। নিয়ত জীবনের কল্যাণ চিন্তায় নিয়োজিত থাকাই হল মেত্তার ভাবনা।
2.করুণা =>
মেত্তা ভাবের মধ্যেই করুণা ভাব নিহিত যার আভিধানিক অর্থ হল দয়া মমতা। মনের জীবের দুঃখে দুঃখ কাতর প্রাণে বিগলিত সমানুভূতির আর এক নাম হল করুণা।
৩. মুদিতা =>
‘মুদিতা’ কথাটির বিভিন্ন অনুবাদে অর্থ করা হয়েছে “সহানুভূতি”। নিজের স্বার্থচিন্তা ত্যাগ করে পরের সুখে তৃপ্তি লাভ হল মুদিতা।
৪. উপেক্ষা =>
‘উপেক্ষা’ কথাটির সাধারণ অর্থ ‘অবজ্ঞা করা’। উপেক্ষার বৈশিষ্ট্য হল পক্ষ পাত শূন্যতা এবং তার আর এক অর্থ হল সত্যের গুণকে উপলব্ধি করা, আসক্তিহীনতা ও মোহমুক্ততা এই দুইরিই [দুইটিরই] সমন্বয় হল উপেক্ষার প্রকাশ। তবে ব্রহ্মবিহারে যে উপেক্ষার কথা বলা হয়েছে তা বাস্তবিক পক্ষে স্বর্গীয় আনন্দ [আনন্দের] চরম ও পরম রূপ।
এই চারটি ভাবনা নিয়েই হল বুদ্ধসম্মত ব্রহ্মবিহার। যার মধ্যে মেত্তার ভাবনাই মুখ্য। এই চারটি ব্রহ্মবিহার অনুশীলনের তিনটি স্তর ভাগ করা হয়েছে। —
i) অন্যান্য মানুষের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব জনিত কর্তব্য।
ii) মনকে সংকীর্ণতার বাধা থেকে মুক্ত করা।
iii) এই সব গুণাবলীর প্রকাশ যেন চিন্তায়, কথায় ও আচরণ বা কর্মের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পায়।
ব্রহ্মবিহার ভাবনা গুরুত্ব =>
ব্রহ্মবিহার উচ্চতর স্তরের জীবনে চরম লক্ষের বা নির্বাণের দিকে নিয়ে যায়। ব্রহ্মবিহারের এই চারটি গুণাবলী দ্বারা জগৎ পরিব্যপ্ত করে থাকে। এই গুণাবলী চারটি সর্ববিষয়ে প্রযোজ্য কারণ, কোন শর্তের অন্তর্গত নয়, আর কোনো সীমারেখা নেই। এই চারটি গুণাবলী এমন এক মানসিক অবস্থাকে নির্দেশ করে যার সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করে পরিভাষাটিকে “অপ্রমান্য” [sic – should likely be ‘অপ্রমেয়’ or ‘অপ্রমাণ’] নামে পরিচিত করেন।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে, ব্রহ্মবিহার আসলে বৌদ্ধদের সাধনা মূলক অনুশীলন প্রাচীন চারটি প্রকার। এই সাধনার অনুশীলনে এমন ইতিবাচক দৃষ্টিশক্তির আলোক বিচ্ছুরিত হয় যে, সমগ্র জগতকে স্পর্শ করে।
- মহাযান মহাপরিনিব্বান সূত্তে বুদ্ধের উপদেশ হল ব্রহ্মবিহার বুদ্ধের, সর্বব্যাপী ধর্মের সারধর্ম। সমস্ত বৌদ্ধ গ্রন্থাবলীতে ব্রহ্মবিহার ভাবনাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখানো হয়েছে এবং ব্রহ্মবিহারের উপযুক্ত সব নির্ভানগামী [sic – potentially meaning ‘liberation-seeking’] ভিক্ষুর অবশ্য পালনীয় ও আচরণীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
- প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, বুদ্ধদেব কথিত ব্রহ্মবিহার ভাবনার সাথে গীতায় উক্ত স্থিতি প্রজ্ঞ ব্রক্ষস্থিতির আপাত সাদৃশ্য রয়েছে। গীতা মতে সুখ দুঃখের সমবুদ্ধি হয়ে ফলাফল ত্যাগপূর্বক কর্ম সাধনাই হল স্থিত প্রজ্ঞের লক্ষণ। এই শান্তিময় অবস্থানকেই গীতায় ব্রহ্মস্থিতি বলে। এই জাতীয় জীবন লাভ করতে চাইলে জীবনে পরম শান্তি লাভ হয়। বুদ্ধদেব ও একই প্রকার ধর্মসাধনার মার্গ সে… মানুষকে পরমানন্দ বা পরম শান্তি লাভ করার উপদেশ দিয়েছিলেন।
- তবে গীতায় বর্ণিত ব্রহ্মস্থিতির সাথে বৌদ্ধদের ব্রহ্মবিহারের মূলগত পার্থক্য আছে। গীতায় উক্ত ব্রহ্মস্থিতির ক্ষেত্রে স্থিত প্রজ্ঞ ব্যক্তি কে হতে হবে নির্মোহ অর্থাৎ মমতা শূন্য। সেখানে প্রেম ও করুনার স্থান নেই। কিন্তু বুদ্ধ মতে মৈত্রী ভাবনায় জাগরিত ব্যাপী প্রেম ভালোবাসাকে প্রসারিত করে অনন্ত স্বরূপ ব্রহ্মের সাথে মিলিত হতে হবে।