
অধিবিদ্যা বলতে কী বোঝ | অধিবিদ্যার স্বরূপ
সংজ্ঞাঃ
যে শাস্ত্র জগৎ ও জীবনের দৃশ্যমান পরিবর্তনশীলতাকে অতিক্রম করে এক অতীন্দ্রিয় শাশ্বত সত্ত্বা বা তত্ত্বের অস্তিত্ব বা স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করে এবং এই বিষয়ে বুদ্ধিগ্রাহ্য একটি ধারণা গঠনের চেষ্টা করে, তাকে তত্ত্ববিদ্যা বা অধিবিদ্যা বলে।
ব্যুৎপত্তিগত অর্থঃ
‘অধিবিদ্যা’ শব্দটির ইংরাজী প্রতিশব্দ হল ‘Metaphysics’। ইংরাজী‘Metaphysics’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করলেই অধিবিদ্যার স্বরূপ বা প্রকৃতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব। ‘Metaphysics’- শব্দটিকে দুটি ভাগে বিভক্তি করা যায় ‘Meta’ ও ‘physics’। ‘Meta’ – কথাটির অর্থ হল ‘পরে’ বা ‘অতিক্রান্ত ‘(beyond) এবং ‘physics’ – কথাটির অর্থ হল ‘পদার্থবিদ্যা’ বা ‘পরিদৃশ্যমান জগৎ’(physical world)।
সুতরাং ‘Metaphysics’ কথার অর্থ দাঁড়াল এমন একটি বিদ্যা বা শাস্ত্র যা পরিদৃশ্যমান জগতের অতীত (beyond the physical world) অর্থাৎ যে শাস্ত্রের আলোচনা পদার্থ বিদ্যার পরে বা পদার্থবিদ্যাকে অতিক্রম করে, তাকে অধিবিদ্যা বলে।
তত্ত্ব ও অবভাসঃ
অধিবিদ্যার স্বরূপ আরো স্পষ্ট করার জন্য ‘তত্ত্ব’(Reality or Numenon) এবং ‘অবভাস’ (appearance or phenomenon) এর মধ্যে পার্থক্য করার প্রয়োজন। জগতের প্রত্যেক বস্তুর দুটি রূপ আছে , একটি হল বস্তুর বাহ্যরূপ বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ, যাকে বলা হয় ‘অবভাস’(Phenomena )। আর দ্বিতীয় রূপটি হল বস্তুর আসল রূপ বা অতীন্দ্রিয় রূপ, যাকে বলে ‘তত্ত্ব’ (Noumena or Reality)।
বস্তুর বাহ্য রূপটি হল অনিত্য, অভিঞ্জতাভিত্তিক এবং নিয়ত পরিবর্তনশীল। অন্যদিকে এই বাহ্য রূপের পিছনে যে আসল রূপ তা অভিঞ্জতা নিরপেক্ষ ও পরিবর্তনীয় এটি বস্তুর আসল রূপ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা আকাশকে নীল দেখি, দুটি সমান্তরাল রেল লাইনকে কিছু দূরে মিলিত হতে দেখি এগুলি সবই বস্তুর বাহ্য রূপ বা অবভাসিক রূপ। এদের আসল রূপ হল – আকাশ নীল নয়, দুটি সমান্তরাল রেললাইন মিলিত হয় না, সুতরাং অধিবিদ্যার মূল লক্ষ্য হল বস্তুর বাহ্য রূপের অন্তরালে যে আসলরূপ আছে তাকে জানা। এই জন্য অধিবিদ্যার অপর নাম ‘তত্ত্ববিদ্যা’। অধিবিদ্যা বস্তুর স্বরূপকে জানতে চায়।
অধিবিদ্যার আলচ্য বিষয়ঃ
অধিবিদ্যায় যে প্রশ্নগুলি আলোচিত হয় তাকে আমরা দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি যথা- ১. তত্ত্ব বিষয়ক ( Ontological) ও ২. ধর্মশাস্ত্র বিষয়ক ( Theological) । তাত্ত্বিক দিক থেকে অধিবিদ্যা যে প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় তা হল –
১. জড়, প্রাণ ও মনের স্বরূপ কী?
২. দেশ,কাল, দ্রব্য, কার্যকারন সম্মন্ধ এদের স্বরূপ কী?
৩. এই দৃশ্যমান জগতের অন্তরালে কি কোন অতীন্দ্রিয় সত্তা আছে কি? যদি থাকে তাহলে তার স্বরূপ কি?
৩. জগতের সৃষ্টিকর্তা রূপে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কী ? যদি থাকে, তাহলে ঈশ্বরের সাথে জগতের সম্পর্ক কী?
অন্যদিকে , ধর্মশাস্ত্র বিষয়ক দিক থেকে অধিবিদ্যা যে প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় তা হল –
১. মৃতুতেই কী জীবনের শেষ? নাকি তার পরেও জীবন আছে?
২ . আমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতা আছে কী?
৩. এই বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্ত ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কী? – ইত্যাদি।
উপসংহারঃ
এই সব প্রশ্নের উপর আলোকপাত করা হল অধিবিদ্যার কাজ। এক কথায় যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের সীমা অতিক্রম করে তাই হল অধিবিদ্যার আলচ্যবিষয়। সুতরাং অধিবিদ্যা ছাড়া দর্শনের আলোচনা অসম্পূর্ন থেকে যায়।
তবে আধুনিক যুগে অনেক দৃষ্টিবাদী দার্শনিকগন অধীবিদ্যার আলোচনা পরিহার করেছেন। দৃষ্টিবাদী দার্শনিক হিউম বলেছেন, অভিজ্ঞতাই জ্ঞান লাভের একমাত্র উপায়,তথাকথিত অতীন্দ্রিয় বিষয়ের জ্ঞান অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পাওয়া যায় না। যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদী দার্শনিক এয়ার(Ayer) বলেছেন- যাচাই যোগ্যতার মানদণ্ডের সাহায্যে “ঈশ্বর আছেন”- এই বাক্যটির আর্থ যাচাই করা যায় না। কেননা ঈশ্বর প্রত্যক্ষের বিষয় নয়। তাই অধীবিদ্যার বাক্যগুলি অর্থহীন বলে অধিবিদ্যা অসম্ভব।
এই সব আপত্তি সত্ত্বেও অধিবিদ্যা দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ন শাখা হয়ে উঠেছে। বর্তমানে অধিবিদ্যাকে সত্তা সংক্রান্ত শাস্ত্র বা Ontology আর্থে গ্রহণ করা হয়।
Thanks For Reading
অধিবিদ্যা বলতে কী বোঝ | অধিবিদ্যার স্বরূপ
আরো পড়ুন