একাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় সেমিস্টারের দর্শন যৌগিক যুক্তি -এর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন গুলি নিয়ে আলোচনা করা হল।

যৌগিক যুক্তি
1. যৌগিক যুক্তি কাকে বলে?
যে অবরোহ যুক্তির কোন অঙ্গবাক্য যৌগিক তাকে যৌগিকযুক্তি বলে। যেমন – প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায় (Hypothetical categorical syllogism), বৈকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায় (Disjunctive Categorical syllogism)
যদি পর্বতে ধূম থাকে তাহলে সেখানে বহ্নি থাকে।
পর্বতটি হয় ধূমবান।
অথএব, পর্বতটি হয় বহ্নিমান।
এটি একটি যৌগিক যুক্তি, কারণ প্রথম আশ্রয় বাক্যটি যৌগিক বাক্য।
2. যৌগিক বচন কাকে বলে?
যে বাক্যকে বিশ্লেষণ করলে অঙ্গবাক্য পাওয়া যায় তাকে যৌগিক বচন বলে। যৌগিক বচনটির সত্যমূল্য নির্ভর করে তার অঙ্গবাক্যের সত্যমূল্যের উপর, অর্থাৎ অঙ্গবাক্যের সত্যমূল্য দেওয়া থাকলে তাদের দ্বারাই যৌগিক বাক্যটির সত্যমূল্য নির্ণয় করা যায়।
যেমন – রামবুদ্ধিমান এবং রাম পরিশ্রমী। এটি একটি যৌগিক বাক্য বা বচন, কারণ ‘রাম বুদ্ধিমান’ ও ‘রাম পরিশ্রমী’ – এই দুটি হল অঙ্গবাক্য।
3. যৌগিক বচন ও অযৌগিক বচন বা নিরপেক্ষ বচন এর মধ্যে পার্থক্য কী?
বচন নানা প্রকারের হয়ে থাকে। একদিক থেকে বচনের দুটি ভাগে ভাগ করা যায় – যৌগিক বাক্য ও অযৌগিক বচন।
যে বচনের কোন অংশ স্বতন্ত্র ভাবে বচন বলে গণ্য হতে পারে তাকে যৌগিক বচন বলে। যথা – রাম আসবে অথবা শ্যাম আসবে এটি একটি যৌগিক বচন। কারণ এর দুটি অংশ স্বতন্ত্রভাবে বচন হতে পারে।
আর যে, বচনের কোন অংশ স্বতন্ত্রভাবে বচন বলে গণ্য হতে পারে না তাকে অযৌগিক বা আনবিক বা নিরপেক্ষ বচন বলে। যথা রাম বুদ্ধিমান এটি অযৌগিক বচন। কারণ এর একটি অংশ স্বতন্ত্রভাবে বচন হতে পারে না।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে, অযৌগিক বাক্যের দ্বারা যৌগিক বাক্য গঠিত হয়। অর্থাৎ একাধিক অযৌগিক বাক্যকে বিভিন্ন যোজক দিয়ে যুক্ত করলে যৌগিক বাক্য পাওয়া যায়।
4. প্রাকল্পিক বচন কাকে বলে?
যে বচনের আকার “যদি তাহলে” থাকে সেই বচনকে প্রাকল্পিক বচন বলে। প্রাকল্পিক বচন দুটি নিরপেক্ষ বচন দ্বারা গঠিত হয় যদির পর যে নিরপেক্ষ বচনটি থাকে তাকে বলে পূবর্গ বা পূর্বকল্প (antecedent) এবং তাহলে এর পরে যে নিরপেক্ষ বচনটি থাকে তাকে বলে অনুগ বা অনুকল্প (Consequent)। যেমন – যদি রাম আসে তাহলে শ্যাম আসবে। এখানে ‘রাম আসে’ পূর্বগ এবং ‘শ্যাম আসবে’- অনুগ। সুতরাং বচনটি প্রাকল্পিক।
5. প্রাকল্পিক ন্যায় কাকে বলে? প্রাকল্পিক ন্যায় কয়প্রকার ও কী কী?
যে ন্যায়ের তিনটি বচনের মধ্যে অন্তত একটি বচন প্রাকল্পিক যদি তাহলে থাকে তাকে প্রাকল্পিক ন্যায় বলে।
যেমন – যদি রাম আসে তাহলে শ্যাম আসবে।
রাম এসেছে।
অথএব, শ্যাম আসবে।
এটি একটি প্রাকল্পিক ন্যায়। কারণ এর প্রথম আশ্রয় বাক্যটি একটি প্রাকল্পিক বচন।প্রাকল্পিক ন্যায় দুপ্রকার
i. মিশ্র প্রাকল্পিক ন্যায় (Mixed Hypothetical syllogism) বা প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায় (Hypothetical categorical syllogism)।
ii. অমিশ্র প্রাকল্পিক ন্যায় (Pure hypothetical syllogism)
i. প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায়
যে প্রাকল্পিক ন্যায়ের অন্তর্গত একটি আশ্রয়বাক্য প্রাকল্পিক বচন, অপর আশ্রয়বাক্য ও সিদ্ধান্তে নিরপেক্ষ বচন তাকে বলে প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায়।
ii. অমিশ্র প্রাকল্পিক ন্যায়
যে প্রাকল্পিক ন্যায়ের অন্তর্গত তিনটি বচনই প্রাকল্পিক বচন তাকে অমিশ্র প্রাকল্পিক ন্যায় বলে।
যেমন – যদি রাম আসে, তাহলে শ্যাম আসবে।
যদি শ্যাম আসে, তাহলে যদু আসবে।
অথএব, যদি রাম আসে, তাহলে যদু আসবে।
6. প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায়ের নিয়মগুলি লেখ এবং নিয়ম ভঙ্গননিয় দোষ গুলি লেখ?
প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায়ের দুটি বৈধ আকারের কথা বলা হয়।
প্রথম আকারটি হল
যদি p তাহলে q ] m.p (Modus ponens) স্বীকৃতিমূলক
p
অথএব, q
এই আকারের বৈধ প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায়কে গঠনমূলক প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায় বলে বা Modus ponens বলে। এক্ষেত্রে নিয়মটি হল – প্রাকল্পিক আশ্রয় বাক্যের পূর্বগটিকে নিরপেক্ষ আশ্রয়বাক্যে স্বীকার প্রাকল্পিক আশ্রয় বাক্যের অনুগকে সিদ্ধান্তে স্বীকার করা হয়। যদি নিরপেক্ষ আশ্রয় বাক্যে প্রাকল্পিক বাক্যের পূর্বগটি স্বীকার না করে অনুগটিকে স্বীকার করে সিদ্ধান্তে টানা হয় তাহলে ন্যায়টি অবৈধ হবে এবং সেক্ষেত্রে অনুগ স্বীকার জনিত দোষ (Fallacy of attiring the consequent) ঘটবে। যথা –
যদি সূর্য ওঠে তাহলে অন্ধকার দূর হয়।
সূর্য উঠেছে।
অথএব, অন্ধকার দূর হয়েছে।
এটি বৈধ প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায়। কিন্তু –
যদি সূর্য ওঠে তাহলে অন্ধকার দূর হবে।
অন্ধকার দূর হয়েছে।
অথএব, সূর্য উঠেছে।
এটি অবৈধ। কারণ এখানে অনুগ স্বীকার জনিত দোষ ঘটেছে।
দ্বিতীয় আকারটি হল
যদি p তাহলে q
এমন নয় যে, q M.T (Modus Tollens) অস্বীকৃতি মূলক
অথএব, এমন নয় যে, p
এই আকারের বৈধ প্রাকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায়কে ধ্বংসমূল বা অস্বীকৃতি মূলক ন্যায় বলে বা Modus Tollens বলে। এক্ষেত্রে নিয়মটি হল – নিরপেক্ষ আশ্রয়বাক্যে প্রাকল্পিক আশ্রয় বাক্যটির অনুগকে অস্বীকার করে সিদ্ধান্তে প্রাকল্পিক আশ্রয় বাক্যের পূর্বগক অস্বীকার করা হয়। কিন্তু যদি নিরপেক্ষ আশ্রয়বাক্যে প্রাকল্পিক বাক্যের অনুগটিকে অস্বীকার না করে পূর্বগকে অস্বীকার করে সিদ্ধান্ত টানা হয় তাহলে তা অবৈধ হবে এবং সেক্ষেত্রে পূর্বগ অস্বীকার জনিত দোষ (Fallacy of denning anticedent) ঘটবে। যথা –
যদি সূর্য ওঠে তাহলে অন্ধকার দূর হয়।
এমন নয় যে, অন্ধকার দূর হয়েছে।
অথএব, এমন নয় যে, সূর্য উঠেছে।
এটি বৈধ ন্যায়। কারণ M.T নিয়ম অনুসরণ করছে। কিন্তু –
যদি সূর্য ওঠে তাহলে অন্ধকার দূর হয়।
এমন নয় যে সূর্য উঠেছে।
অথএব, এমন নয় যে, অন্ধকার দূর হয়েছে।
এটি অবৈধ। কারণ এখানে পূর্বগ অস্বীকার জনিত দোষ ঘটেছে।
7. বৈকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায় কাকে বলে? এই প্রকার ন্যায়ের বৈধতার নিয়ম কী? নিয়মগুলো লঙ্গন করলে যে দোষ ঘটে তা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।
যে ন্যায় এমন যার প্রথম আশ্রয়বাক্য বৈকল্পিক বাক্য, দ্বিতীয় আশ্রয়বাক্য একটি নিরপেক্ষ বাক্য যা প্রথম হেতুবাক্যের কোন অঙ্গবাক্য বা কোন অঙ্গবাক্যের নিষেধ বাক্যে এবং সিদ্ধান্তটি একটি নিরপেক্ষ বাক্য যা প্রথম হেতুবাক্যের কোন বিকল্প বা বিকল্পের নিষেধ বাক্য। তাকে বৈকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায় বা বৈকল্পিক নিষেধ বাক্য, তাকে বৈকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায় বা বৈকল্পিক ন্যায় বলে।
যেমন – রাম বোকা অথবা রাম বদমাশ।
এমন নয় যে, রাম বোকা।
অথএব, রাম বদমাশ।
বৈকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায়ের দুটি বৈধ আকার আছে।
প্রথম বৈধ আকারটি হল
P অথবা q
এমন নয় যে, p . D.S
অথএব, q
দ্বিতীয় বৈধ আকারটি হল
P অথবা q
এমন নয় যে, p D.S
এই প্রকারের বৈধ বৈকল্পিক নিরপেক্ষ ন্যায়ের নাম হল Disjunctive syllogism বা D.S এক্ষেত্রে নিয়মটি হল – বৈকল্পিক আশ্রয়বাক্যের একটি বিকল্প দ্বিতীয় আশ্রয়বাক্যে অস্বীকার করে সিদ্ধান্তে অপর বিকল্পকে স্বীকার করতে হবে।
কোন বৈকল্পিক ন্যায়ের দ্বিতীয় আশ্রয়বাক্যে প্রথম আশ্রয় বাক্যের কোন বিকল্পকে অস্বীকার করার পরিবর্তে স্বীকার করে সিদ্ধান্তে অপর বিকল্পকে অস্বীকার করলে যে দোষ দেখা দেবে তাকে বিকল্প স্বীকার বা পরিগ্রহন জনিত দোষ বলে। [Fallacy of affirming a Disjunctive]
যেমন – রাম এসেছে অথবা শ্যাম এসেছে।
রাম এসেছে
অথএব, এমন নয় যে শ্যাম এসেছে।
এই বৈকল্পিক ন্যায়টিতে দ্বিতীয় আশ্রয়বাক্যে প্রথম আশ্রয় বাক্যের একটি বিকল্পকে অস্বীকার করে সিদ্ধান্তে অপর বিকল্পকে স্বীকার করা হয়। তাই ন্যায়টি বিকল্প পরিগ্রহণ জনিত দোষে দুষ্ট।
8. বিসংবাদী ও অবিসংবাদী বৈকল্পিক কাকে বলে?
বিসংবাদী বৈকল্পিক বাক্য হল সেই বাক্য যার দুটি বিকল্প পরস্পর বিরুদ্ধ। দুটি বিকল্প একই সঙ্গে সত্য হতে পারে না, অর্থাৎ একটি বিকল্প সত্য হলে অন্য বিকল্পটি মিথ্যা হবে। যেমন – ‘যে জীবিত অথবা সে মৃত’। – এই দুটি বিকল্পের একটি সত্য হলে অপরটি মিথ্যা হবে। কারণ কোন মানুষ একই সঙ্গে জীবিত এবং মৃত হতে পারে না।
অবিসংবাদী বৈকল্পিক বাক্য হল সেই সেই বাক্য যার দুটি বিকল্প পরস্পর বিরুদ্ধ নয়, একটি বিকল্প সত্য হয় এবং দুটি বিকল্প একই সঙ্গে সত্য হতে পারে। যেমন – ‘সে শিক্ষিত অথবা যে ধনী’ – এই দুটি বিকল্পটি একই সঙ্গে সত্য হতে পারে। কারণ কোন ব্যক্তি একই সঙ্গে শিক্ষিত এবং ধনী হতে পারে
Thanks For Reading
বচেনর বিরোধিতা একাদশ শ্রেণি
More Post:
ভারতীয় নীতিবিদ্যা একাদশ শ্রেণি প্রশ্ন
যুক্তি বিজ্ঞানের প্রকৃতি অবরোহ এবং আরোহ