বি.এ. ন্যায় দর্শন –এর একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন হল – ব্যাপ্তি কাকে বলে। ব্যাপ্তি গ্রহণ বা ব্যাপ্তি নির্নয় কীভাবে হয় তা আলোচনা করো এই নিয়ে আলোচনা করা হল।

ব্যাপ্তি কাকে বলে। ব্যাপ্তি গ্রহণ বা ব্যাপ্তি নির্নয় কীভাবে হয় তা আলোচনা করো।
অন্নংভট্ট ‘তর্ক সংগ্রহ’ গ্রন্থে ব্যাপ্তির লক্ষণ প্রসঙ্গে বলেছেন – ‘যত্র যত্র ধূমঃ তত্র অগ্নিঃ ইতি সহচার্য নিয়মঃ ব্যাপ্তিঃ।’ অর্থাৎ যেখানে ধূম সেখানে বহ্নি এরূপ ধূমের সাথে বহ্নির যে সহচার্য নিয়ম তাকে বলে ব্যাপ্তি। ‘সহচার্য’ শব্দটির অর্থ সমানাধিকরন অর্থাৎ একই অধিকরণে থাকা বোঝায়। দুটি বিষয় একই অধিকরণে থাকলে অর্থাৎ হেতু ও সাধ্য একই অধিকরণে অবস্থান করলে তাদের মধ্যে সহচর সম্বন্ধ আছে তা বুঝতে হবে। ন্যায় দর্শনে যে কোনো সমানাধিকরন সম্বন্ধকে ব্যাপ্তি বলা হয়না। হেতু ও সাধ্যের অর্থাৎ ব্যাপ্য ও ব্যাপকের মধ্যে নিয়ত অব্যভিচারী, অনৌপাধিক সহচর সম্বন্ধকেই ব্যাপ্তি বলা হয়। যেমন –
পর্বতে বহ্নি আছে।
কেননা পর্বতে ধূম আছে।
যেখানে ধূম বহ্নি আছে।
অতএব, পর্বতে বহ্নি আছে।
এই অনুমানের তৃতীয় বাক্যটি ব্যাপ্তি জ্ঞান। ব্যাপ্তি জ্ঞানের পরেই অনুমান সম্পূর্ন হয় বলে অনুমানের কারন হল ব্যাপ্তি।
ব্যাপ্তি গ্রহণ
ব্যাপ্তি জ্ঞান হল অনুমানের ভিত্তি। দুটি বিষয়ের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ সামান্য বচনের দ্বারা প্রকাশ করা হয় কিন্তু প্রশ্ন হল কীভাবে ব্যাপ্তি প্রকাশক এই সামান্য বচন পাওয়া যায়? এটি আরোহ অনুমানের একটি সমস্যা। ন্যায় মতে, ব্যাপ্তি নির্নয়ের ৬ টি পদ্ধতি আছে। সেগুলি হল –
1. অঞয়
দুটি বিষয়ের একই উপস্থিতি হল অঞ্বয় দুটি বিষয়ের একত্র উপস্থিতি ব্যাখ্যা করে ব্যাপ্তিকে জানা যায়। যেমন – ধূম ও বহ্নিকে বরাবার একই সাথে উপস্থিত দেখে বলা যায় ধূম ও বহ্নির মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ আছে।
2. ব্যতিরেক
ব্যতিরেক কথার অর্থ হল অনুপস্থিত বা অভাব। দুটি বিষয়ের একত্র অনুপস্থিত লক্ষ্য করে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ জানা যায়। যেমন – যেখানে বহ্নি নেই সেখানে ধূম নেই। ধূম ও বহ্নির একত্রে অনুপস্থিত সম্বন্ধ থেকে তাদের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ নির্নয় করা যায়।
3. ব্যভিচারাগ্রহ
‘ব্যভিচার’ বলতে বোঝায় বিরুদ্ধ দৃষ্টান্ত এবং ‘আগ্রহ’ বলতে বোঝায় অদর্শন বা দেখতে না পাওয়া। সুতরাং ব্যভিচারা গ্রহ বলতে বোঝায় বিপরীত দৃষ্টান্তের অভাব। দুটি বিষয়ের একটির উপস্থিতি ও অন্যটির অনুপস্থিতি এরূপ দৃষ্টান্ত না দেখলে তাদের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ আছে বলা যায়। যেমন – ধূম আছে অথচ বহ্নি নেই এমন দৃষ্টান্ত না দেখলে তাদের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ আছে বলে জানা যায়।
4. উপাধিনিরাস
‘উপাধি’ বলতে বোঝায় শর্ত এবং ‘নিরাস’ বলতে বোঝায় দূর করা। দুটি বিষয়ের মধ্যে কোন উপাধি বা শর্ত না থাকলে তাদের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ থাকে। যেমন – ধূম ও বহ্নির সম্বন্ধ উপাধিহীন বলে তাদের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ আছে।
5. তর্ক
তর্কের সাহায্যে নৈয়ায়িকগণ মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ের বিরুদ্ধ বচনকে মিথ্যা প্রমাণ করে পরোক্ষ ভাবে মূল বক্তব্য সত্যতা প্রমাণ করেন। যেমন – ‘সকল ধূমবান বস্তু হয় বহ্নিমান।’ এই সামান্য বচনটি মিথ্যা হলে এর বিরুদ্ধ বচন ‘কোন ধূমবান বস্তু নয় বহ্নিমান।’ এই বচনটি অবশ্যই সত্য হবে। কিন্তু দ্বিতীয় বচনটি কার্য – কারন সম্বন্ধের বিরোধী। তাই প্রথম বচনটি সত্য।
6. সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষ
নৈয়ায়িকগণ বলেন আমরা যখন কোন বিশেষ স্থানে ধূম ও বহ্নি প্রত্যক্ষ করি তখন ধূমের সামান্য ধর্ম ‘ধূমত্ব’ এবং বহ্নির সামান্য ধর্ম ‘বহ্নিত্ব’ প্রত্যক্ষ করি। ধূমত্ব প্রত্যক্ষের মাধ্যমে সর্বকালের ধূমের এবং বহ্নিত্ব প্রত্যক্ষের মাধ্যমে সর্বকালের বহ্নির অলৌকিক প্রত্যক্ষ হওয়ায় ধূম ও বহ্নির ব্যাপ্তি সম্বন্ধ যথার্থ হয়।
Thanks For Reading
ব্যাপ্তি কাকে বলে। ব্যাপ্তি গ্রহণ বা ব্যাপ্তি নির্নয় কীভাবে হয় তা আলোচনা করো।
More Post:
ন্যায় মতে ব্যাপ্তি কয়প্রকার ও কী কী
স্বার্থানুমিতি ও পরার্থানুমিতির পার্থক্য লেখো
অনুমিতির লক্ষণ দাও | পক্ষ সাধ্য ও হেতুর পরিচয়