মার্কের শ্রেণী তত্ত্ব দ্বন্দ নিয়ে আলোচনা কর

বি.এ. সমাজ ও রাষ্ট্র  দর্শনের –এর একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন হল– মার্কের শ্রেণী তত্ত্ব দ্বন্দ নিয়ে আলোচনা কর। এই নিয়ে আলোচনা করা হল।

মার্কের শ্রেণী তত্ত্ব দ্বন্দ নিয়ে আলোচনা কর। 
মার্কের শ্রেণী তত্ত্ব দ্বন্দ নিয়ে আলোচনা কর।

 

মার্কের শ্রেণী তত্ত্ব দ্বন্দ নিয়ে আলোচনা কর। 

মানব সমাজ পরিবর্তনশীল। সামাজিক শ্রেণীর ধারনাটিও তাই কালে কালে পরিবর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন সমাজ বিজ্ঞানী বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সামাজিক শ্রেণী সম্পর্কে আলোচনা করেছে। বস্তুবাদী সমাজতাত্ত্বিক কাল মার্কস উৎপাদন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে সামাজিক শ্রেণীর পরিচয় দিয়েছেন। মার্কসবাদে শ্রেণী সম্পর্কে বলা হয়েছে-“Any aggregate of persons who play the same part in the production mechanism.”অর্থাৎ এমন যে কোনো ব্যক্তিবর্গ যারা উৎপাদন ব্যবস্থায় একই ভূমিকা পালন করে তাই হলো শ্রেণী।

মার্কসীয় মতবাদ অনুসারে ,সমবিভাজন ও উৎপাদন উপকরণের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানাকে কেন্দ্র করে সমাজে শ্রেণীর উদ্ভব হয়। সমাজে উৎপাদন ব্যবস্থায় বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন রকম ভূমিকা গ্রহণ করে। আদিম সাম্যবাদী সমাজে উৎপাদনের উপকরণের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে উৎপাদন সামগ্রি কমে যাওয়ার ফলে সমাজে সৃষ্টি হল শ্রেণী ভেদ। একে অন্যের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে লাগল সম্পদের মালিকানাকে কেন্দ্র করে। ক্ষমতা প্রয়োগ করে যারা টিকে রইল তারা মালিক শ্রেণী এবং যারা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারল না অর্থাৎ যারা পরাজিত হল তারা হল দাস শ্রেণী।

দাস সমাজে ২ টি শ্রেণী ছিলো মালিক শ্রেণী ও দাস শ্রেণী। দাসেদের শ্রম শোষণ করে মুষ্টিমেয় মালিক শ্রেণী সম্পদ শ্রেণী হয়ে ওঠে। দাস সমাজের ইতিহাস হলো এই ২ টি শ্রেণীর মধ্যে বিরতিহীন শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। পরবর্তি পর্যায়ে সামন্ত সমাজ সামন্ত প্রভু ও ভূমিদাস এই ২ টি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সামন্তপ্রভু ভুমিদাসদের অবাধে শোষণ করতে থাকে এইজন্য সামন্তযুগের ইতিহাস হলো অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস। বর্তমানকালের সমাজ ধনতান্ত্রিক সমাজ। ধনতান্ত্রিক সমাজ পরস্পর বিরোধী শিল্পপতি বা বুর্জোয়া এবং শ্রমিক শ্রেণী বা সর্বহারা এই ২ টি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শ্রমিক শ্রেণীর দ্বারা সৃষ্ট উদবৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করাই হল ধনতান্ত্রিক সমাজে মালিক শ্রেণীর স্বরূপ। বুর্জোয়ারা খেটে খাওয়া শ্রেণীর ওপর শোষণ করতে থাকে, শোষণ যখন মাত্রা ছাড়া হয় তখনই দেখা যায় সংগ্রাম। অর্থাৎ সর্বহারা শ্রেণী রাষ্ট্র শক্তি দখল করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল হয়। এর পরিণতিতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়ে থাকে।

মার্কসের মতে, সমাজে ২ টি শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্বের সূচনা তখনই হয় যখন শ্রেণী চেতনার উন্মেষ ঘটে। ‘শ্রমিক শ্রেণীর প্রত্যেকে যে মালিক শ্রেণীর দ্বারা শোষিত হয়ে চলেছে যার অবসান প্রয়োজন’- এমন মনোভাব ও সংকল্প দেখাদিলে তবেই শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে শ্রেণী চেতনা জাগ্রত হতে পারে এবং তখনই তারা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লবের পথ বেছে নেয়।

মার্কস শ্রমিকদের ২ ভাবে বিচার করেছেন- (i). শ্রমিক শ্রেণী হিসাবে এক বিশেষ শ্রেণী (A plus in itself) এবং (ii). শ্রেণী চেতনার উদ্ভূত শ্রমিক শ্রেণী (A plus for itself)। প্রথম ক্ষেত্রে মনোভাব থাকে আমাদের সবার আর্থিক অবস্থা একরকম, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে শ্রমিক্রা তাদের স্বার্থ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হয় অর্থাৎ তাদের মধ্যে শ্রেনি চেতনা জাগ্রত হয়।

মার্কসের মতে, শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে শ্রেনি চেতনা জাগিয়ে তোলে সামাজিক পরিবেশ। সামাজিক পরিবেশে শ্রমিক যখন দেখে সে যতটা শ্রম নিয়োগ করছে ততটা পরিমাণে মজুরি পাচ্ছেনা। এর ফলে শ্রমিকদের মধ্যে এই চেতনা জাগবে যে তারা মালিক শ্রেনী দ্বারা শোষিত হচ্ছে। এই মনোভাব জাগলে তারা নিজেদের স্বার্থ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মালিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে বিপ্লবের পথে অগ্রসর হয়। মার্কসবাদী লেলিন মনে করেন –‘কমিউনিস্ট পার্টির আসল কাজ হলো শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে শ্রেণী চেতনা জাগ্রত করে বিপ্লবের সূচনা এবং শ্রেণীহীন চেতনার দিকে অগ্রসর হওয়া।’ মার্কসের মতে, শ্রেণী চেতনার শর্তগুলি হল – শিল্পের কেন্দ্রিকরন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন, মালিক ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য জাগানো ইত্যাদি।

সমালোচনা

 মার্কসের শ্রেণীতত্ত্ব সমালোচনার উদ্ধে নয়।

প্রথমত

মার্কস চেয়েছিলেন শ্রেণীদ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু মার্কসের সমাজতন্ত্রবাদ আজ পর্যন্ত বাস্তবে ফল প্রসূত হয়নি। ধনতান্ত্রিক দেশগুলিকে দেখা যায় শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণী তাদের জীবিকার মানের উন্নতি ঘটাতে সমর্থ হলেও ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করতে পারেনি ।

দ্বিতীয়ত

হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে প্রয়োগ করে মার্কস সঠিক কাজ করেননি । সমাজ পরিবর্তন কেবল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়না, সমাজ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন হল মানুষের ভাবনা চিন্তা, ধ্যান-ধারনা, বিজ্ঞান-দর্শন, কৃষ্টি ইত্যাদি।

তৃতীয়ত

সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মার্কস কেবল বুর্জোয়া ও শ্রমিক এই দুটি শ্রেণীর কথা উল্লেখ করেছেন, তৃতীয় শ্রেণী রূপে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কথা উল্লেখ করেননি। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সদস্যরা( পুঁজিপতি,ব্যবসায়ী,চাষি,শিক্ষক,চাকুরীজীবী) সমাজ পরিবর্তনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো।

সুতরাং, উৎপাদন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে মালিক ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্বই একমাত্র সমাজ পরিবর্তনের কারন একথা বলা যায় না।


Thanks For Reading:

“সমাজ হল সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল”- কে বলেছেন 

More Post:

পরিবার কাকে বলে | পরিবার বলতে কী বোঝো

সমাজে পরিবারের ভূমিকা কী | সমাজে পরিবারের ভূমিকা

সামাজিক প্রগতি কাকে বলে | সামাজিক প্রগতি কি