“সমাজ হল সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল”- কে বলেছেন

বি.এ. সমাজ ও রাষ্ট্র  দর্শনের –এর একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন হল– “সমাজ হল সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল”- কে বলেছেন এই নিয়ে আলোচনা করা হল।

“সমাজ হল সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল”- কে বলেছেন
“সমাজ হল সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল”- কে বলেছেন

“সমাজ হল সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল”- কে বলেছেন

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানুষ কোনো না কোনো সমাজে বাস করে আসছে। সমাজকে বাদদিয়ে মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘যে মানুষ সমাজ ছাড়া বাস করতে চায় সে হয় পশু, না হয় দেবতা।’ সমাজের মধ্যেই মানুষ জন্মায়, ক্রমশ বেড়ে ওঠে এবং সহযোগিতা ও অসহযোগিতার মধ্য দিয়ে জীবনে সফল ও ব্যর্থ হয়। তাই সমাজকে বাদ দিলে মানুষের জীবন শূন্যতায় পর্যবসিত হয়।

এখন প্রশ্ন হল সমাজ কি? এর উত্তরে গিসবার্ট বলেছেন-“Socity, in general, consists, in the complicated network of social relationship by which every human being interconnected with his fellow men.”(Fundamentals of sociology) অর্থাৎ সাধারণভাবে সমাজ হল বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্কের জটিল জাল, যে সম্পর্কগুলির দ্বারা প্রতিটি মানুষ তার সঙ্গীদের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে থাকে।

সমাজ কোনো প্রত্যক্ষগ্রাহ্য মূর্ত বিষয় নয় সমাজ হলো বিমূর্ত সামাজিক সম্পর্ক। ম্যকাইভার ও পেজ তাই সমাজের সংজ্ঞায় বলেছেন–“It is the wab of social relationship and it is always changing.” অর্থাৎ সমাজ হলো সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল, যা নিয়ত পরিবর্তনশীল।

এখন প্রশ্ন হলো – সামাজিক সম্পর্ক কী? প্রথমেই বলা দরকার যে, যে কোন ধরনের সম্পর্কই সামাজিক সম্পর্ক নয়। বিভিন্ন জড়বস্তুর মধ্যে সম্পর্ক সামাজিক সম্পর্ক নয়, কারন এদের মধ্যে কোন সচেতন বোধ থাকে না। অর্থাৎ যেখানে সচেতনতা নেই সেখানে সামাজিক সম্পর্ক নেই।

এই জন্য গিসবার্ট বলেছেন-“Social ability or society is a mental phenomenon.” অর্থাৎ সামাজিক সম্পর্ক সম্পূর্নভাবে এক মানসিক ব্যাপার। যেখানে দুজন বা তার থেকে বেশি মানুষ পরস্পর পরস্পরের সম্পর্কে সচেতন হয় এবং তাদের কয়েকটি বিষয়ে যে সাদৃশ্য আছে সে বিষয়ে সচেতন থাকে, তাই হল সামাজিক সম্পর্ক। 

কোন সম্পর্ককে সামাজিক সম্পর্ক হতে গেলে প্রধানত ২ টি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে- i. একের উপস্থিতি সম্পর্কে অন্যের চেতনা ও ii. সাধারণ লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের ধারনা। এই ২ টি বৈশিষ্ট্যের সমাবেশে যে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাই হলো সমাজ। তাই ম্যাকাইভার ও পেজ বলেছেন- “Society is a complicated network of social relationship” অর্থাৎ সমাজ হলো পারস্পারিক সচেতনতা ভিত্তিক বহু সামাজিক সম্পর্কের এক নিয়ত পরিবর্তনশীল জটিল জটাজাল।

সামাজিক সম্পর্ক অসংখ্য ও বিচিত্র। সামাজিক জটিলতাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এইসব সম্পর্কও জটিল হয়ে পরে। ম্যাকাইভার এই রকম সম্পর্কের কতকগুলি উদাহরণ দিয়েছেন। যেমন মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক, মালিকের সঙ্গে শ্রমিকের সম্পর্ক, কর্মে নিযুক্ত কর্তার সঙ্গে কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তির সম্পর্ক, স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক, বন্ধুর সঙ্গে অন্য বন্ধুর সম্পর্ক, ছাত্রে সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্ক ইত্যাদি সবই সামাজিক সম্পর্কের দৃষ্টান্ত।

সামাজিক সম্পর্ক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বন্ধুত্বপূর্ন, শত্রুতাপূর্ন,ব্যক্তিগত ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। যেমন- ভোটপ্রার্থী ও ভোটদাতার সম্পর্ক রাজনৈতিক সম্পর্ক, ক্রেতা-বিক্রেতা ও মালিক শ্রমিকের সম্পর্ককে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বলতে হয়।

বিভিন্ন প্রকার সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে যেমন চেতনাগত মিল ও ঐক্য রয়েছে, তেমনি অমিল ও বিতর্কও রয়েছে। এই মিল অমিলের দ্বন্দ্ব থেকেই গড়ে ওঠে সমাজ। তবে একথা ঠিক যে মিল অমিলের পূর্ববর্তী। এ প্রসঙ্গে ম্যাকাইভার ও পেজ বলেছেন-“The likeness of men’s wants is necessarily prior to differentiation of social organization.” অর্থাৎ মানুষের চাহিদার মিল অনিবার্যভাবে সমাজ সংগঠনের অন্তর্গত অমিলের পূর্ববর্তি। ম্যাকাইভার বলেছেন, শ্রমবিভাজনের মুখ্য বৈশিষ্ট্য হলো মিল বা সহযোগিতা এবং গৌণ বৈশিষ্ট্য হল অমিল বা বিভাজন।

সমাজের মধ্যে যদি শুধু মিল থাকে বা ঐক্যই থাকত তাহলে সমাজের বন্ধন আলগা হয়ে যায়, পাস্পারিক আদান প্রদানের কোন সুযোগ থাকে না। মিল-অমিল, সহযোগিতা-বিরোধিতা ইত্যাদি সম্পর্ক নিয়েই সমাজ। এই অমিল বিভিন্ন ধরনের হতে পারে মানুষে মানুষে আকৃতিগত, গঠনগত, শিক্ষাগত ও রীতিগত প্রভেদ রয়েছে। তবে সমাজ জীবনে শুধু অসহযোগিতা ও বিরোধিতাই থাকে তাহলে তা দুর্বিসহ হয়ে পরে।আবার, শুধুই সহযোগিতা থাকলে তা সমাজের প্রগতি ও পরিবর্তনকে ব্যহত করে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, সামাজিক সম্পর্ক বিচিত্র ও বহুমুখী এবং এইসব সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে সমাজ ও সামাজিক জীবন। এই জন্যই ম্যকাইভার ও পেজ বলেছেন সমাজ হলো বিভিন্ন সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল।


Thanks For Reading:

“সমাজ হল সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল”- কে বলেছেন 

More Post:

চার্বাক নীতিবিদ্যা | চার্বাক সুখবাদ

চার্বাক মতে আত্মা কী | চার্বাক দর্শন

চার্বাক মতে শব্দ প্রমাণ নয় কেন

চার্বাক মতে অনুমান কেন প্রমান নয়

পরিবার কাকে বলে | পরিবার বলতে কী বোঝো

সমাজে পরিবারের ভূমিকা কী | সমাজে পরিবারের ভূমিকা

সম্প্রদায় কী | সম্প্রদায় ও সংঘের পার্থক্য