বি.এ. ন্যায় দর্শন –এর একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন হল – ন্যায় দর্শনে অলৌকিক শব্দের অর্থ কী। উদাহরণ সহ বিভিন্ন প্রকার অলৌকিক প্রত্যক্ষ গুলি লেখ এই নিয়ে আলোচনা করা হল।

ন্যায় দর্শনে অলৌকিক শব্দের অর্থ কী। উদাহরণ সহ বিভিন্ন প্রকার অলৌকিক প্রত্যক্ষ গুলি লেখ।
লৌকির শব্দের নঞ্চর্থক শব্দ হল অলৌকিক ন্যায় দর্শনে অলৌকিক বলতে এমন একটি সম্বন্ধকে বোঝানো হয়েছে যেখানে কোনো ইন্দ্রিয় তার নিজ বিষয় নয় এমন বিষয়ের সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করে এবং বিষয়টিকে প্রত্যক্ষ করতে সাহায্যে করে অর্থাৎ অলৌকিক শব্দটি এমন একটি সম্বন্ধের ঈঙ্গিত দেয় যেখানে সম্বন্ধটি স্বাভাবিক নয় কোনো ইন্দ্রিয় নিজ বিষয় ভিন্ন অন্য কোনো বিষয়ের সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করলে যে প্রত্যক্ষ উৎপন্ন হয় তা অলৌকিক প্রত্যক্ষ এবং অলৌকিক প্রত্যক্ষ যে সন্নিকর্ষের দ্বারা হয় তাকে অলৌকিক সন্নিকর্ষ বলে। অলৌকিক প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে অলৌকিক সন্নিকর্ষ হয় বলে ৬ প্রকার লৌকিক সন্নিকর্ষের একটিও এখানে ভূমিকা পালন করে না।
ন্যায় মতে অলৌকিক সন্নিকর্ষের জন্য যে প্রত্যক্ষ হয় তাকে অলৌকিক প্রত্যক্ষ বলে। ন্যায় মতে অলৌকিক প্রত্যক্ষ ৩ প্রকার যথা –
সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষ
ন্যায় মতে একটি বস্তুর সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের লৌকিক সন্নিকর্ষ হলে ওই বস্তুর সামান্য ধর্মের জ্ঞানের মাধ্যমে ওই সামান্য ধর্মের সকল আশ্রয় যে প্রত্যক্ষ হয় তাকে সামান্য লক্ষণ অলৌকিক প্রত্যক্ষ বলে। যেমন – একটি মানুষের মধ্যে ‘মনুষ্যত্ব জাতি’প্রত্যক্ষের মাধ্যমে, অন্য দেশে ও অন্য কালে স্থিত সকল মানুষের প্রত্যক্ষ হয় কিন্তু অন্য দেশীয়, অন্যকালীয় সকল মানুষ ইন্দ্রিয়ের সাথে সংযোগ হয় না। তাই মনুষ্যত্ব জাতি প্রত্যক্ষ করে সকল মানুষের প্রত্যক্ষ হল সামান্য লক্ষ্যণ প্রত্যক্ষ। এক্ষেত্রে সামান্য ধর্ম সন্নিকর্ষ হিসাবে কাজ করে। যে ধর্ম একজাতীয় বিষয়ের প্রতিটি ব্যাক্তিতে সমানভাবে উপস্থিত থাকে তাকে সামান্য ধর্ম বলে।
আচার্য বিশ্বনাথ বলেছেন সামান্য নয়, সামান্য ধর্মের জ্ঞানই সন্নিকর্ষ হিসাবে কাজ করে। তা না হলে ‘ধূলিতে ধূম’ এই ভ্রান্ত প্রত্যক্ষকে ব্যাখ্যা করা যায় না। ধূলিতে ধূলিত্ব এই সামান্য ধর্ম থাকে, এতে কখোনো ধোয়াত্ব থাকে না কিন্তু গ্রীষ্মকালে ধূলির ঝড়কে ধূম বলে ভ্রান্ত জ্ঞান উৎপন্ন হয়। এর কারণ হল স্মৃতির ভাসমান ধূমত্ব সামান্য জ্ঞানটি এখানে ধূলিতে আরোপিত হয়ে সম্বন্ধ স্থাপন করে। তাই সামান্য নয়, সামান্য ধর্মের জ্ঞানই অলৌকিক সন্নিকর্ষের জন্য দায়ী।
সামান্য লক্ষ্যন প্রত্যক্ষ স্বীকারের স্বপক্ষে নব্য নৈয়ায়িক আচার্য বিশ্বনাথ যে যুক্তি দিয়েছিলেন তা হল – সামান্য লক্ষ্যন প্রত্যক্ষ স্বীকার না করলে ব্যাপ্তিজ্ঞান সম্ভব হয়না। এবং ব্যাপ্তিজ্ঞান না হলে অনুমান সম্ভব নয়। কয়েকটি বিশেষ স্থানে ধূমের সাথে বহ্নির উপস্থিতি দেখে আমরা বলি ধূম বহ্নিব্যাপ্য। যেহেতু আমরা সমস্ত ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করতে পারি না তাই আমাদের মনে সংশয় জাগে। সামান্য লক্ষণ সন্নিকর্ষ স্বীকার না করলে এই সংশয়ের নিদর্শন হয় না। তাছাড়া অভাবের জ্ঞানের ক্ষেত্রে যার অভাব নিজে আশ্রয় থাকে না। এক্ষেত্রে অভাবে বা প্রতিযোগির সামান্য জ্ঞানই বিশেষণ হিসাবে ওই অভাবের জ্ঞান হয়, তাই সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষ ছাড়া অভাবের জ্ঞান হয়, তাই সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষ ছাড়া অভাবের জ্ঞান হয় না।
জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ
অতীত জ্ঞানের সাহায্যে বিষয় প্রত্যেক্ষের ক্ষেত্রে, প্রত্যক্ষের বিষয়ের সাথে ইন্দ্রিয়ের যে অলৌকিক সন্নিকর্ষ জনিত প্রত্যক্ষ হয় তাকে জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ বলে। দূর থেকে বরফ দেখে ঠান্ডার অনুভূতি হয় অথবা দূর থেকে চন্দন কাঠ দেখে অনেক সময় চন্দনের সুরোভি প্রত্যক্ষ হয়। কিন্তু ঠান্ডার অনুভূতি তত্ত্বের দ্বারা এবং গন্ধের অনুভূতি নাসিকার দ্বারা হয়। কিন্তু উভয়ক্ষেত্রে চক্ষু ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভূতি জন্মাচ্ছে। এর কারণ হল অতীতে ত্বকের দ্বারা বরফের শীতলতা এবং নাসিকার দ্বারা চন্দন কাঠের সুরোভি প্রত্যক্ষ হয়েছিল। এক্ষেত্রে অতীত জ্ঞানের স্মৃতি অলৌকিকভাব সন্নিকর্ষ উৎপন্ন করছে। কাজেই যখন অতীত জ্ঞানের স্মৃতির সাহায্যে এক ইন্দ্রিয়ের নির্দিষ্ট বিষয় অন্য ইন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রত্যক্ষ করা হয় তখন তাকে জ্ঞান লক্ষণ প্রত্যক্ষ বলে।
জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ স্বীকারের স্বপক্ষে নব্য নৈয়ায়িকগণ কিছু যুক্তি উত্থাপন করেছেন। জ্ঞানলক্ষণ অলৌকিক সন্নিকর্ষ স্বীকার না করলে অনেক সময় প্রত্যক্ষ জ্ঞানকে ব্যাখ্যা করা যায় না। দূর থেকে একটি সরোবরে প্রস্ফুটিত পদ্মের সমাবেশে দেখে আমাদের যে সুরোভির অনুভূতি হয় আমাদের মনে যে কাব্যিকভাব গড়ে ওঠে তার ব্যাখ্যার অনুভূতি হয় তার ব্যাখায় দেওয়া সম্ভব হবে না যদি না জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ স্বীকার করা হয়। এই ধরনের বাস্তব দৃষ্টান্তের ক্ষেত্রে পূর্ব স্মৃতিজনিত অলৌকিক সন্নিকর্ষ স্বীকার অবশ্যই করতে হবে।
তাছাড়া ভ্রান্তিমূলক প্রত্যক্ষের ব্যাখ্যা জ্ঞানলক্ষণ প্রত্যক্ষ দিয়েই সম্ভব অতীতের কোন জ্ঞান যখন ভিন্ন অধিকরণে অরোপিত হয় তখন ভ্রম প্রত্যক্ষ জন্মায়। মুক্তিতে রজত ভ্রমের ক্ষেত্রে রজতের পূর্ব স্মৃতি সন্নিকর্ষ স্থাপন করে বলে এরূপভ্রান্তি জন্মায়।
যোগজ প্রত্যক্ষ
যোগী পুরুষ বা সিদ্ধ পুরুষগণ যে অলৌকিক উপায়ে বর্তমান অতীত ভবিষ্যৎ অর্থাৎ ত্রৈকালিক সুক্ষ ও পদার্থের প্রত্যক্ষ করেন। সে ক্ষেত্রে যে সংজ্ঞার প্রয়োজন হয় তাকে যোগজ প্রত্যক্ষ বলে। স্মৃতি ও পুরান মতে যোগভ্যাসের গুনে যোগীগণ এই অলৌকিক ক্ষমতা বলে জীবাত্মা ও পরমাত্মা বিষয়ে তাদের মানস প্রত্যক্ষ হয়।
যোগজ প্রত্যক্ষ দুই প্রকার যুক্ত ও যুঞ্জান। সিদ্ধ পুরুষদের যোগজ প্রত্যক্ষ নিত্য ও স্বতঃ স্ফুট। এর যুক্তিযোগী। কিন্তু যারা এখন ও সাধনায় সিদ্ধ লাভ করেনি তারা যুঞ্জান যোগী। এদের যোগজ প্রত্যক্ষ সামরিক ও অল্প সময় ধরে থাকে।
ভারতীয় দর্শনে সকল সম্প্রদায় ন্যায় দর্শন স্বীকৃত তিন প্রকার অলৌকিক প্রত্যক্ষ স্বীকার করেননি সাংখ্য বেদান্ত যোগজ প্রত্যক্ষ স্বীকার করছেন। আবার মীমাংসা দর্শনে যোগজ প্রত্যক্ষ অস্বীকৃত। নব্যনৈয়ায়িক রঘুনাথ শিরোমণি আবার সামান্য লক্ষণ প্রত্যক্ষ অস্বীকার করছেন।
Thanks For Reading
ন্যায় দর্শনে অলৌকিক শব্দের অর্থ কী। উদাহরণ সহ বিভিন্ন প্রকার অলৌকিক প্রত্যক্ষ গুলি লেখ।
More Post:
ন্যায় মতে লৌকিক সন্নিকর্ষ কাকে বলে
জৈনদের মতে স্যাৎবাদ কী ব্যাখ্যা কর