বি.এ. জৈন দর্শন –এর একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন হল – জৈনদের অনেকান্তবাদ সমালোচনা সহ ব্যাখ্যা করো এই নিয়ে আলোচনা করা হল।

জৈনদের অনেকান্তবাদ সমালোচনা সহ ব্যাখ্যা করো
জৈনদের অনেকান্তবাদ একটি অধিবিদ্যক। জৈনদের অনেকান্ত বাদ অনুযায়ী বস্তু অনন্তগুণবিশিষ্ট। সত্ত্বা নিত্য ও অনিত্য উভয়েই। জৈনদের সত্ত্বা সম্পর্কিত মতবাদই অনেকান্তবাদ নামে পরিচিত।
জৈন মতে, বস্তু অনন্তগুনবিশিষ্ট – ‘অনন্তধর্মকং বস্তু। ’অনন্তধর্মী বস্তুর মধ্যে যেমন স্থিতিশীল অংশ আছে, তেমনি পরিবর্তনশীল অংশও আছে। সদ্বসত্ত্বর মাত্রই উৎপত্তি, বিনাশ ও স্থায়িত্ব আছে। “উৎপাদ ব্যয় ধ্রৌব্য যুক্তং সৎ।” উৎপত্তি ও বিনাশ হল বস্তুর পরিবর্তনশীল বা সতিশীল ধর্ম এবং স্থায়িত্ব বস্তুর স্থিতিশীল অংশ। সদ্বসত্ত্বর দুটি ধর্ম রয়েছে গুণ ও পর্যায়। গুণ হল বস্তুর স্থিতিশীল ধর্ম ও পর্যায় হল বস্তুর পরিবর্তনশীল ধর্ম। গুনধর্মানুযায়ী বস্তু এক নিত্য ও সৎ এবং পর্যায় ধর্মানুযায়ী, বস্তু বহু, অনিত্য ও অসৎ। একইভাবে আত্মার চেতনা স্থিতিশীল, নিত্য এবং কামনা – বাসনা, মোহ, সুখ- দুঃখ ইত্যাদি হল আত্মার পরিবর্তনশীল দিক। কিন্তু বৌদ্ধরা এবং দন্ধোগ্য উপনিষদ একটি চরম সত্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করেছেন। তাই উভয়েই ‘একান্তবাদী’ নামে পরিচিত।
জৈন মতে, প্রতিটি বস্তুর অসংখ্য ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক রয়েছে। ইতিবাচক দিক দিয়ে যেমন প্রতিটি বস্তুকে বিশেষ শ্রেণীভুক্ত করা যায়, তেমনি নেতিবাচক দিক দিয়ে এক বস্তুকে অপর বস্তু থেকে পৃথক করতে পারি। যেমন – এক ব্যক্তির দৈহিক কাঠামো, শিক্ষা – দীক্ষা, বেশভূষা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য ভিত্তি তাকে এক শ্রেণীভুক্ত করা যায় এবং তার নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের দ্বারা তাকে অপরব্যক্তি বা প্রানীদের থেকে পৃথক করা যায়। তাই সকল বস্তুই জটিল ও অনন্ত ধর্মবিশিষ্ট। এসব কারণে কোন বস্তুকে লৌকিক জ্ঞান দ্বারা পূর্নাঙ্গরূপে জানা যায়না, আংশিকভাবে জানা যায়। সাধারণ মানুষ কোন এক বিশেষ দৃষ্টিকোন থেকে কোন বস্তুর বিশেষ গুণ সম্পর্কে জানতে পারে। তাই বস্তু সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান আংশিক, সম্পূর্ন নয়। কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ জীব কেবল জ্ঞান লাভে অসমর্থ। একমাত্র কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত সিদ্ধপুরুষ কেবল জ্ঞান লাভে সমর্থ। লৌকিক জ্ঞান মাত্রই আংশিক বা আপেক্ষিক, আর এই আপেক্ষিক জ্ঞান পূর্ন সত্য নয় আবার পূর্ন মিথ্যা নয়। এক বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে সত্য বলে মনে হলেও অপর দৃষ্টি কোন থেকে তা মিথ্যা বলে বিবেচিত। জৈন মতে, এই আংশিক জ্ঞানই হল ‘নয়। ’ আর এই ‘নয়’-কে পূর্নঙ্গ রূপে জানতে জৈনরা অনেকান্ত মতবাদ প্রতিষ্ঠাতা করেছেন।
জৈনদের অনেকান্তবাদে আপেক্ষিকতাবাদ প্রতিষ্ঠাতা পেয়েছে। এ মতে, সকল বস্তুই অন্যান্য সব বস্তুর সাপেক্ষ। এজন্য জৈনরা বলেন ‘যিনি একটি বস্তু জানেন,তিনি সকল বস্তুকেই জানেন।’ জৈনরা বলেন সাধারণ মানুষের জ্ঞান বিভিন্ন অন্ধ ব্যক্তির হস্তি জ্ঞান সদৃশ্য আংশিক জ্ঞান। যে অন্ধ ব্যক্তি হাতির পা স্পর্শ করে, তার কাছে হাতির পা ‘হস্তি সম্ভবৎ’। যে ব্যক্তি হস্তির পৃষ্ঠদেশে স্পর্শ করে তার কাছে হাতির পষ্ঠ – ‘হস্তি পূর্ববৎ’, যে অন্ধব্যক্তি হাতির কান স্পর্শ করে তার কাছে হস্তির কান – ‘হস্তি কুলাবৎ।’ এভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি হস্তির বিভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হয় এবং নিজ সিদ্ধান্তকে সত্য বলে মনে করে। কিন্তু তা পূর্নাঙ্গ সত্য নয়, আংশিক সত্য, জৈনরা বলেন একদিকে নিত্যতা যেমন – সত্য তেমনি পরিবর্তনশীলতাও সত্য। জৈন মতে, হস্তী অনন্ত গুণ বিশিষ্ট হওয়া বিভিন্ন অন্ধব্যক্তি বিশেষ বিশেষ দৃষ্টিকোন থেকে বিশেষ বিশেষ আংশিক জ্ঞান লাভ করে, হস্তীর পূর্নাঙ্গ জ্ঞান হয় না। জৈনদের ‘একান্তবাদের’ বিরুদ্ধে এই মতবাদই ‘অনেকান্তবাদে’ নামে পরিচিত।
সমালোচনা
বৌদ্ধ ও বেদান্তিকগন জৈনদের অনেকান্তবাদের বিরোধীতা করে বলেন অনেকান্তবাদ ন্যায় শাস্ত্রের বিরোধী। বৌদ্ধগণ বলেন একই বস্তু স্থিতিশীল ও পরিবর্তনশীল হতে পারে না, এই পরস্পর বিরোধী ধর্ম একই বস্তুতে অবস্থান ন্যায় শাস্ত্রের বিরোধ। ন্যায় শাস্ত্রনুযায়ী যে বস্তু স্থিতিশীল, তা কখনই গতিশীল হতে পারে না এবং যে বস্তু গতিশীল, তা কখনই স্থিতিশীল হতে পারে না। কিন্তু জৈনরা বৌদ্ধ ও বেদান্তিকদের এই মতবাদের বিরুদ্ধে বলেন অল্পজ্ঞাতার জন্যই বৌদ্ধরা এই সমালোচনা করেছেন। তাদের মধ্যে কেবল জ্ঞান থাকলে এই বিরোধীতার প্রশ্ন উঠতো না। অর্থাৎ বৌদ্ধরা লৌকিক দিক থেকে এবং জৈনরা পারমাত্তিক দিক থেকে বস্তু বা সত্ত্বার জ্ঞানকে বিশ্লেষণ করেছে।
জৈনদের অনেকান্তবাদ ন্যায় শাস্ত্রের বিরোধী নয়। জৈনরা বলেন লৌকিক জ্ঞানের দিক থেকে কোন এক দৃষ্টিকোন থেকে কোনবস্তু স্থিতিশীল এবং অপর এক দৃষ্টিকোন থেকে সেই বস্তু পরিবর্তনশীল। তাই বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে একই বস্তু স্থিতিশীল ও গতিশীল হওয়ার পরস্পর বিরোধীতার প্রশ্ন অযৌক্তিক। জৈনরা বলেন পারমাত্তিক দিক থেকে এই বিরোধীতার প্রশ্নই উঠবেনা।
Thanks For Reading
জৈনদের অনেকান্তবাদ সমালোচনা সহ ব্যাখ্যা করো
More Post:
চার্বাক নীতিবিদ্যা | চার্বাক সুখবাদ
জড়বাদ ও আধ্যাত্মবাদের মূল পার্থক্য
চার্বাক মতে আত্মা কী | চার্বাক দর্শন
চার্বাক মতে শব্দ প্রমাণ নয় কেন
চার্বাক মতে অনুমান কেন প্রমান নয়