বাংলা রচনা পর্বে অজকের আলোচনার বিষয় হল – দেশ ভ্রমণের উপযোগিতা রচনা। ছাত্র ছাত্রীদের কাছে খুব সহজ ভাবে দেশ ভ্রমণের উপযোগিতা রচনা রচনাটি তুলে ধরা হল।

দেশ ভ্রমণের উপযোগিতা রচনা
“ বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী।
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু।
কত না অজানা জীব, কত না অপরিচিত তবু।
রয়ে গেল অগোচরে।”
ভূমিকা
আমরা সুদূরের পিয়াসী। বৈচিত্র্যের স্বাদ গ্রহণের তৃষ্ণা আমাদের বক্ষ জুড়ে। ইঙ্গিতে সুদূর আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাইতো আমরা বেরিয়ে পড়ি সুদূরের আহ্বানে। দিনযাপনের, প্রাণধারণের ক্লান্তিকর একঘেয়েমি থেকে আমরা মুক্তি চাই। আমাদের ‘পথ চলতেই আনন্দ।” চলার নাম জীবন, থেমে যাওয়ার নাম মৃত্যু। তাই উপনিষদ বলছে- “চরৈবেতি-চরৈবেতি-চরৈবেতি।” শুধু কি আনন্দ! শিক্ষাও যে আছে।
শিক্ষার অঙ্গ
ভ্রমণ আমাদের শিক্ষাগুরু। বিদ্যালয়ের চার দেওয়ালের সীমিত গণ্ডির মধ্যে শুষ্ক পুঁথির পাতায় আবদ্ধ থেকে বিদ্যার্থীর সম্যক জ্ঞান হতে পারে না। চাই জ্ঞাতব্য বিষয়ের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের প্রত্যক্ষ যোগ। শিক্ষাকে সর্বাঙ্গসুন্দর এবং বাস্তবে রূপ দান করতে হলে দরকার দেশভ্রমণ। মানচিত্রে আঁকা দেশ, আর ছাপা অক্ষরে রাজরাজড়া ও মানুষের ইতিহাস পড়ে আমরা সামান্যই শিখি। সেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় দেশভ্রমণে। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের নানাবিধ প্রশ্নের মীমাংসা হয়, জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধতর হয়। সুতরাং স্কুল-কলেজে ভ্রমণ আবশ্যক হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ভ্রমণের আনন্দ
প্রাত্যহিকতার গ্লানি অপনোদনের জন্য আমরা বারবার সমুদ্রে, পর্বতে, অরণ্যে ছুটে যাই। দেশভ্রমণ আমাদের সেই পথ চলার আনন্দ যোগায়। দেশভ্রমণের মধ্য দিয়েই কত নতুন দেশ, কত নতুন পথের হদিশ পেয়েছেন ভ্রমণ পিপাসুরা। দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার পার হয়ে তাঁরা পৃথিবীর বহু রহস্য উন্মোচন করেছেন। কলম্বাস, ভাস্কো-দা-গামা, কুকসাহেব বাইরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশ আবিষ্কার করেছেন। ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাঙ, মেগাস্থিনিস, ইবনবতুতার দল নতুন দেশের শিক্ষা সংস্কৃতি সভ্যতার সম্যক পরিচয় লাভের জন্য যুগে যুগে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আজও আমরা অতীশ দীপঙ্কর, ক্যাপ্টেন কুক, বিজয় সিংহ এঁদের কথা ভুলতে পারি না।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও মানসিক উদারতা
ভ্রমণ মানুষের মনের সংকীর্ণতা দূর করে। যখন আমরা ভিন্ন দেশ বা অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের সংস্পর্শে আসি, তখন আমাদের মধ্যে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। এটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
উপকারিতা
কর্মক্লান্ত মানুষ দেশভ্রমণের মধ্য দিয়ে সজীব এবং প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। হতাশার ভাব কাটিয়ে নতুন উদ্যমে অধিকতর কর্মক্ষমতা এবং উদার মনোবৃত্তি সম্পন্ন হয়ে ওঠে। সংকীর্ণ মনোবৃত্তি দূর হয়ে যায় ভ্রমণের আনন্দে। ভ্রমণ যে কেবল শিক্ষা ও চিত্ত বিনোদনের জন্যে ভারতেই স্বীকৃত তা নয়, সারা পৃথিবীতেও স্বীকৃত। এই ভ্রমণ এখন অর্থোপার্জনের উপায় হিসাবে দেশের উন্নতিবিধায়ক পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে পরিগণিত।
দেশভ্রমণের আবশ্যিকতা
পুঁথিগত বিদ্যাকে যাচাই করার অন্যতম উপায় হলো বাস্তবজীবনে তাকে প্রয়োগ করা। বই পড়ে যা জানা যায়, তাকে বাস্তব জীবনে মিলিয়ে নেওয়া এই ভেবে যে, কতখানি জীবন-সম্ভব সেই বিদ্যা। যা আমরা পড়ি তা যদি জীবনে কাজে না লাগে, তাহলে সে পড়ার অর্থ কী? আমরা অনেক কিছুর সূত্র মুখস্থ করি, জীবনে তার প্রয়োগ কতখানি যথাযথ, তা ভেবে দেখি না; এজন্য শিক্ষার অনেকখানি বাদ পড়ে যায়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় সেজন্য দেশভ্রমণকে সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষত, কতকগুলি বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য ঘরে বসে থাকলে চলে না। শিক্ষামূলক দেশভ্রমণ ছাত্রজীবনে অমূল্য সহায়ক।
দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ও বিশ্বমানবিকতা
মানুষ যখন নিজের গণ্ডির বাইরে বের হয় না, তখন সে কূপমণ্ডূক হয়ে থাকে। ভ্রমণের ফলে মানুষ বিভিন্ন দেশ ও জাতির ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হয়। এই পরিচয়ের ফলে মনের সংকীর্ণতা ও কুসংস্কার দূর হয়। মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা বাড়ে এবং মনে এই বোধ জাগ্রত হয় যে—”নানা বরণ গভি রে ভাই, একই বরণ দুধ / জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।” এই বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলাই ভ্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মনের উদারতা
দেশে দেশে ঘুরে আমরা বিচিত্র মানুষের সংস্পর্শে আসি। তাদের জীবন ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে পরিচিত হই। মানবতার উদার ক্ষেত্রে সকলের সঙ্গে আত্মিক যোগস্থাপনের ফলে আমাদের মনের সংকীর্ণতা দূর হয়, ফলে আমরা বিশ্বঘরের বাসিন্দা হয়ে যাই। ঘরে ঘরে খুঁজে পাই পরমাত্মীয়।
উপসংহার
দেশভ্রমণ দেশের ব্যাবসা-বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক মনকে উন্নত করে। একদেশের সাহিত্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য দেশের পরিচয় ঘটায়। এইভাবেই বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধের উন্মেষ ঘটে। দেশভ্রমণের মাধ্যমেই বিশ্ব এক পরিবারে পরিণত হতে পারে। নদী যদি স্রোত হারিয়ে ফেলে তাহলে শৈবাল বাসা বাঁধে, তেমনি মানুষ যদি ভ্রমণের স্পৃহা এবং ভ্রমণের অভ্যাস পরিত্যাগ করে তাহলে আত্মগ্লানির সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। তাই দেশভ্রমণ জরুরি।
Thanks For Reading:
দেশ ভ্রমণের উপযোগিতা রচনা
More Post: