সামাজিক শ্রেণী কি | জাতি কাকে বলে

বি.এ. সমাজ ও রাষ্ট্র  দর্শনের –এর একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন হল– সামাজিক শ্রেণী কি। জাতি কাকে বলে। জাতি ও সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য। এই নিয়ে আলোচনা করা হল।

সামাজিক শ্রেণী কি। জাতি কাকে বলে
সামাজিক শ্রেণী কি। জাতি কাকে বলে

 

সামাজিক শ্রেণী কি। জাতি কাকে বলে। জাতি ও সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য। 

শ্রেণী শব্দটি একটি বহুল প্রচলিত হওয়ায় এর সার্বজনীন সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে শ্রেণী সম্পর্কিত ধারনাও বদলে গেছে, ভবিষ্যতে আরও পরিবর্তন হবে। সামাজিক শ্রেণী সম্পর্কে বিভিন্ন সামাজতাত্ত্বিকগন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে সামাজিক শ্রেণীর সংজ্ঞা ও শ্রেণীবিভাগ করেছেন। 

সামাজিক শ্রেণী

সামাজিক শ্রেণী সম্পর্কে গিসবার্ট বলেছেন, “সামাজিক শ্রেণী বলতে বোঝায় সম্প্রদায়ের বিশেষ কোন অংশকে বা জনগোষ্ঠীকে যারা সমতার ভিত্তিতে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং সমাজ স্বীকৃত উঁচু নিচু মানদণ্ডের দ্বারা এক জনগোষ্ঠী অপরা পর জনগোষ্ঠী থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে।” গিসবার্টের শ্রেণীর সংজ্ঞাকে বিশ্লেষণ করলে করলে ২ টি গুরুত্বপূর্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যথা- (i). মর্যাদা অনুযায়ী শ্রেনি উঁচু নিচু ভাবে অবস্থান করে। (ii). শ্রেণী মর্যাদা সমাজ স্বীকৃত হয় এবং শ্রেণীর সদস্যরা ঐ মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকে। 

সমাজে প্রচলিত প্রত্যেক শ্রেণীর অন্তর্গত সদস্যদের মধ্যে সামান্য ব্যপারে পার্থক্য থাকলেও তাদের পারস্পারিক শ্রেণী সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি হয়না। প্রত্যেক শ্রেণী অন্য শ্রেণীর থেকে উচ্চতর ভাবে বা নিম্নতর ভাবে সম্বন্ধের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্নভাবে অবস্থান করে।
সামাজিক শ্রেণীর আচার আচরণের মূলে আছে সমাজ স্বীকৃত মূল্যবোধ। যেমন- যারা উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত তারা তাদের পোশাক পরিচ্ছেদ, শিক্ষা দীক্ষা ও বৃত্তিনির্বাচনে ওই শ্রেণীর মান-মর্যাদাকে অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করে। এই কথাটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর ক্ষেত্রে একই ভাবে প্রযোজ্য। সুতরাং সামাজিক শ্রেণী হলো এমন এক মানবগোষ্ঠী যাদের আচার ব্যবহার অন্যান্য মানবগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র এবং শ্রেণী মর্যাদা সমাজ স্বীকৃত।

জাতি

‘জাতি’ কথাটির ইংরাজি প্রতিশব্দ হল –‘Caste’ যার উৎপত্তি হয়েছে ‘Casta’ নামক স্প্যানিশ শব্দ থেকে। ‘Casta’ শব্দটির অর্থ হলো জাত বা কূল, সংস্কৃতে ‘জন্‌’ ধাতু থেকে ব্যুৎপত্তি হয়েছে ‘জাত’ শব্দটির। কথাটির ভিত্তি হল জন্ম, জাত হল জন্মভিত্তিক তাই তা অপরিবর্তনীয়। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, জাত হল একটি বদ্ধ, বংশানুক্রমিক অন্তবৈবাহিক গোষ্ঠী। কুলি তার ‘Social Organisation’ গ্রন্থে জাতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন-“When a class is same what strictly herstory, we may call it is a caste.” অর্থাৎ ‘জাত হলো এমন একটি মানবগোষ্ঠী যা চিরাচরিত বা বংশ পরম্পরায় অভিন্ন বৃত্তি অনুযায়ী সংগঠিত হয়ে থাকে।

জাতি ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করলে কতকগুলি বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পাওয়া যায়। বংশানুক্রমিকতা , অন্তবৈবাহিক সম্পর্ক, সামাজিক সচলতার অভাব, জাতগত বিধিবিধান বিভিন্ন জাতের জীবনধারনগত বৈষম্য, বংশানুক্রমিক বৃত্তি প্রভৃতি জাতব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য । ভারতের জাতিভেদ প্রথা প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত রয়েছে। প্রাচীনকালে জাতির পরিবর্তে বর্ন কথাটি ব্যবহার করা হত। বর্ন ব্যবস্থা অনুযায়ী মানুষ ৪ টি বর্নে বিভক্ত ছিল। যথা- ব্রাম্ভন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র। কালক্রমে এইসব বর্ন ব্যবস্থা থেকে জাতির উদ্ভব হয়েছে এবং প্রত্যেক জাতি থেকে আবার নানা উপজাতির উদ্ভব হয়েছে। বর্তমানে ভারতের জাতির সংখ্যা সঠিক ভাবে নির্নয় করা সহজসাধ্য নয়। বটোমোরের হিসেব অনুযায়ী ভারতের এক একটা বৃহৎ অঞ্চলের প্রায় ২৫০০ জাতি আছে।

জাতি ও সামাজিক শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য

সামাজিক স্তর বিন্যাসের পরিপেক্ষিতে সামাজিক শ্রেণী ও জাতি (বর্নবৈষম্য) এর মধ্যে কতকগুলি পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

প্রথমত

সামাজিক শ্রেণী হল সচল। কিন্তু জাতি হল নিশ্চল। সমাজের নিম্ন স্তরভুক্ত মানুষ যদি তার যোগ্যতা ও দক্ষতার জন্য অর্থ ও মর্যাদার উচ্চস্তর ভুক্ত মানুষের আচার আচরণ করে তাহলে সে ক্রমশই উচ্চ স্তরে উন্নীত হয় তাই বলা যায় সামাজিক শ্রেণী সচল। অর্থাৎ সামাজিক শ্রেণী হল মুক্ত সমাজ আর জাতি হলো রুদ্ধ সমাজ।

দ্বিতীয়ত

শ্রেণীভেদ ব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ বা ঐতিহাসিক। কিন্তু জাতিভেদ ব্যবস্থার ভিত্তি হল ধর্ম। জাত পাত ব্যবস্থার মূলে রয়েছে জন্মান্তরবাদ বা কর্মবাদ। কিন্তু শ্রেণী ব্যবস্থার উৎপত্তির মূলে এরকম কোনো ব্যবস্থা নেই।

তৃতীয়ত

সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও সেই পার্থক্য খুবই প্রকট নয়। কিন্তু জাতি ব্যবস্থায় বর্নভেদ অনুযায়ী সামাজিক অনুষ্ঠানের, আচার-আচরণে, পোশাক পরিচ্ছেদে ও আহার- বিহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।

চতুর্থত

সামাজিক শ্রেণী ব্যবস্থায় একজন ধনীব্যক্তি একজন দরিদ্র ব্যক্তির কন্যাকে বিবাহ করলে ধনী শ্রেণী থেকে সে শ্রেণীচ্যুত হয় না কিন্তু জাতিভেদ ব্যবস্থায় বিবাহ ব্যপারটি স্বজাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কোন এক জাতের সদস্য যদি অন্য জাতের কোনো সদস্যকে বিবাহ করে তবে তাকে জাতিচ্যুত হতে হয়। যেমন- কোন ব্রাম্ভন সন্তান যদি কোনো শুদ্রের কন্যাকে বিবাহ করে তাহলে তাকে শাস্ত্রিয় বিধান অনুসারে জাতিচ্যুত হতে হয়।

পঞ্চমত

সামাজিক শ্রেণী সামাজিক সুযোগ সুবিধার বৈষম্য ও সামাজিক শ্রেণী সামাজিক সুযোগ সুবিধার বৈষম্য ও সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য অনুযায়ী গড়ে ওঠে। কিন্তু জাতি হলো রক্ত সম্পর্কিত বা জন্ম ভিত্তিক ও বংশানুক্রমিক সম্বন্ধে আবদ্ধ এক জনগোষ্ঠী।

ষষ্ঠত

সামাজিক শ্রেণীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শ্রেণী চেতনা ও শ্রেণী সংহতি। কিন্তু জাত ব্যবস্থার মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়না।

সপ্তমত

শ্রেণী ব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ অর্থাৎ শ্রেণী সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোনো ঐশ্বরিক ধারনার উল্লেখ নেই। কিন্তু জাত ব্যবস্থা সৃষ্টির ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক ধারনার উল্লেখ করা যায়। অতএব, জাত ব্যবস্থা ধর্মনির্ভর।

সামাজিক শ্রেণী ও জাত ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য দেখাতে গিয়ে অধ্যাপক গিসবার্ট বলেছেন, এই ২ টি বিষয়ের এমন সব প্রভেদ ২ টি মৌলিক বৈশিষ্ট্য থেকে বেড়িয়ে আসে তা হল ঘনিষ্ঠতা ও পবিত্রতা।

সামাজিক শ্রেণী ও জাতের উপরিউক্ত বেশকিছু পার্থক্য এখনও স্বীকার করা হয় না। সামাজিক শ্রেনিবিন্যাসের ক্ষেত্রে ও জাত ব্যবস্থার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। জন্মভিত্তিক জাত মর্যাদার মতই সামাজিক শ্রেণীর মর্যাদাও অনেকখানি আরোপিত। আবার জাত ব্যবস্থার মধ্যেও সামাজিক শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। সুতরাং, আধুনিক কালে শ্রেণী ও জাতির মধ্যে বিভেদ কমে এসেছে।


Thanks For Reading:

“সমাজ হল সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল”- কে বলেছেন 

More Post:

চার্বাক নীতিবিদ্যা | চার্বাক সুখবাদ

চার্বাক মতে আত্মা কী | চার্বাক দর্শন

চার্বাক মতে শব্দ প্রমাণ নয় কেন

চার্বাক মতে অনুমান কেন প্রমান নয়

পরিবার কাকে বলে | পরিবার বলতে কী বোঝো

সমাজে পরিবারের ভূমিকা কী | সমাজে পরিবারের ভূমিকা

সম্প্রদায় কী | সম্প্রদায় ও সংঘের পার্থক্য