চার্বাক মতে আত্মা কী | চার্বাক দর্শন

বি.এ. চার্বাক দর্শনের –এর একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন হল – চার্বাক মতে আত্মা কী – এই নিয়ে আলোচনা করা হল। এবং এই প্রশ্নটি থেকে তোমারা দেহাত্মবাদ কী এই নিয়েও জানতে পারবে।

চার্বাক মতে আত্মা কী 
চার্বাক মতে আত্মা কী

চার্বাক মতে আত্মা কী 

বৌদ্ধ ছাড়া সব আধ্যাত্মবাদী ভারতীও দর্শনে আত্মাকে নিত্য, শাশ্বত সত্ত্বা বলা হয়েছে । চার্বাকরা এই মতবাদের বিরোধিতা করেছেন। চার্বাক মতে , ‘চৈতন্য বিশিষ্ট দেহ এব আত্মা’। অর্থাৎ চৈতন্য বিশিষ্ট দেহই হল আত্মা। চৈতন্য দেহেরই গুন। দেহ- ক্ষিতি, অপ ,তেজঃ ও মরুৎ এই  উপাদান দ্বারা গঠিত। চর্তুভূত তাদের স্বভাব বশত বা যচচ্ছ মিলিত হয়। এই সংমিশ্রনে যখন দেহের উৎপত্তি হয় তখনই চৈতন্যের আর্বিভাব ঘটে।

প্রশ্ন হতে পারে, চর্তুভূতের কোন উপাদানেরই পৃথকভাবে চৈতন্য থাকে না। তারা জড় বা অচেতন । তাহলে চর্তুভূত থেকে কীভাবে চৈতন্যের উৎপত্তি হয়? চার্বাকগন এর উত্তরে বলেন যে, পান,চুন,খয়ের এদের কোনটিতেই পৃথকভাবে লাল রঙ নেই। কিন্তু এদের একত্রে চর্বন করলে লাল রঙের আভা দেখা দেয়। সুরা উৎপাদক বস্তু,যেমন চাল,গুড় ইত্যাদিতে মাদক শক্তি নেই , কিন্তু একত্রে সংমিশ্রন করলে মাদকতার সৃষ্টি হয়। তেমনি ভূতচতুষ্টয়ে পৃথকভাবে চৈতন্য না থাকলেও এদের সংমিশ্রনে যে দেহ তাতে চৈতন্যরূপ গুণের আর্বিভাব হয়। এই মতবাদই ‘দেহাত্মবাদ’ বা ‘ভূচৈতন্যবাদ’ নামে পরিচিত।

চার্বাক দেহাত্মবাদ কী

প্রথমত

চার্বাক মতে, দেহ অতিরিক্ত আত্মা কোন স্থলেই প্রত্যক্ষ করা যায় না। চৈতন্য দেহের উপর নির্ভরশীল । যেখানে চৈতন্য দেখা যায় সেখানেই তা দেহের অন্তর্গত । যেখানে দেহ নেই সেখানে আত্মাও নেই । এইভাবে অম্বয়-ব্যতিরেকির সাহায্যে বোঝা যায় যে চৈতন্য দেহের ধর্ম। মৃত্যুকালে দেহের বিনাশের সাথে সাথে চৈতন্যের বিনাশ ঘটে।একটি প্রদীপের আলো ততক্ষণই থাকে যতক্ষণ অগ্নি থাকে অগ্নি না থাকলে আলো থাকে না । সুতরাং চৈতন্য দেহেরই গুন।

দ্বিতীয়ত

 চার্বাক মতে দেহ ও আত্মা পৃথক নয়। তাঁরা বলেন, ‘আমি স্থূল’, ‘আমি কৃষ্ণ’, ‘আমি সুস্থ’- এরূপ প্রত্যক্ষ উপলব্ধি হয়। আমি বা আত্মা দেহ ভিন্ন হলে এসব উক্তির কোনো অর্থই হয় না ,কারন দেহই স্থূল , দেহই কৃষ্ণবর্ন । অর্থাৎ আমি বলতে দেহ, দেহ অতিরিক্ত আত্মা নয়। তাই চার্বাকগনের অভিমত হল –“দেহাতিরিক্ত আত্মানি প্রমানাভাবাৎ

       ধূত চার্বাকগন স্থূল দেহকেই আত্মার সঙ্গে অভিন্ন মনে করতেন। কিন্তু চার্বাকদের অপর সম্প্রদায়, সুশিক্ষিত চার্বাকগন ইন্দ্রিয়, মন ও প্রাণকে আত্মা বলে স্বীকার করে আধ্যাত্মবাদের দিকে কিছুটা অগ্রসর হয়েছেন।

তৃতীয়ত

দেহ পুষ্ট হলে চৈতন্য বা আত্মাও পুষ্ট হয়। পুষ্টিকর খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করলে দেহের পুষ্টির সাথে সাথে চৈতন্যের ও পরিপুষ্টি হয়। সুতরাং চৈতন্য দেহ অতিরিক্ত সত্তা নয়।

চতুর্থত

দেহ অসুস্থ হলে মানসিক শক্তি বা চৈতন্য বিশেষ ভাবে হ্রাস পায় । আবার বার্ধক্যে দেহ ক্ষীন হলে বুদ্ধির দুর্বলতা প্রকাশ পায়। অতএব দেহই আত্মা।

সমালোচনা

ভারতীয় দর্শনে চার্বাক দেহাত্মবাদ তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছে। তাঁরা নানা যুক্তি দিয়ে এই মতবাদ খণ্ডন করে দেহঅতিরিক্ত আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন।

প্রথমত

চৈতন্যর আধার রূপে আত্মার অস্তিত্ব অবশ্যই স্বীকার্য । দেহ যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ চৈতন্যও থাকে একথা স্বীকার করতে হয়। কিন্তু এরূপ দেখা যায় যে , প্রাণহীন দেহে চৈতন্য থাকে না । সুষুপ্তিকালে দেহ থকলেও চৈতন্য থাকে না। যেমন কোন ব্যক্তির স্বপ্নকালীন অবস্থা থেকে উত্থিত হলে স্বপ্নকালীন চেতনা থাকলেও স্বপ্নে দৃষ্ট দেহ থাকে না।

দ্বিতীয়ত

 চার্বাক দেহাত্মবাদ ব্যখ্যা করলে স্মৃতি ও প্রত্যভিজ্ঞা প্রভৃতি ব্যখ্যা করা যায় না। দেহ আত্না হলে বাল্যকালের স্মৃতি যৌবনে স্মরণ হবে না । কারন বাল্যকালের শরীর যৌবনে থাকে না। কিন্তু সকলে বাল্যকালের স্মৃতি যৌবনে স্মরণ করতে পারে। শরীর কর্তা হলে এরূপ স্মরণ সম্ভব হতো না। সুতরাং দেহ অতিরিক্ত নিত্যআত্মা অবশ্য স্বীকার্য।

পূর্বদৃষ্ট পদার্থের পুনরায় প্রত্যক্ষগোচর হলে পূর্বের সংস্কার দ্বারা যে জ্ঞান হয়, তা হল প্রত্যভিজ্ঞা । প্রত্যভিজ্ঞার জন্য স্মরণ প্রয়োজন । সুতরাং দেহঅতিরিক্ত আত্মা স্বীকার না করলে প্রত্যভিজ্ঞা ব্যখ্যা করা যায় না ।

তৃতীয়ত

নৈয়ায়িকগন বলেন, শরীরের চক্ষুরাদি প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের কর্তা হতে পারে না। কেননা শরীরের চৈতন্য নেই । শরীর অচেতন তাই অচেতন কর্তা হতে পারে না। সুতরাং দেহঅতিরিক্ত আত্মার অস্তিত্ব অবশ্য স্বীকার্য।

চতুর্থত

চার্বাক দেহাত্মবাদ স্বীকার করলে কর্মবাদ ব্যখ্যা করা যায় না। কর্মবাদ অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষতার কৃতকর্মের শুভ-অশুভ ফল ভোগ ক্রবে। কিন্তু দেহই আত্মা হলে কর্মবাদ সিদ্ধ হতে পারে না, কারন দেহ ক্ষনে ক্ষনে পরিবর্তনশীল । সুতরাং দেহঅতিরিক্ত আত্মা অবশ্য স্বীকার্য।

পঞ্চমত

শঙ্করাচার্যের মতে দেহ , উৎপন্ন হয় , বিনষ্ট হয়, অল্পকাল বর্তমান থাকে ,পরিণাম প্রাপ্ত হয়। সুতরাং জড় দেহ কখনই চৈতন্য স্বরূপ আত্মা হতে পারে না । আর যার ‘আমি ’

বলতে দেহকে মনে করে তারা অজ্ঞান , জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে ‘আমি’ হল নিত্য শুদ্ধ চৈতন্য বা আত্মা।


Thanks For Reading: চার্বাক মতে আত্মা কী / চার্বাক দর্শন / দেহাত্মবাদ কি

More Post:

চার্বাক নীতিবিদ্যা | চার্বাক সুখবাদ